আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) থেকে শুরু হচ্ছে নতুন বছর ২০২৬। বিদায়ী ২০২৫ সাল রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামাজিক চ্যালেঞ্জের বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে প্রতিটি সংকট নতুন শিক্ষা রেখে গেছে। এই শিক্ষা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে ২০২৬ হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনা, পরিবর্তন এবং দায়িত্বশীল রাজনীতি ও উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের বছর। বিশেষ করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মানুষ আশা ও পরিবর্তনের নতুন সঞ্চার অনুভব করছেন।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তার পর এই নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন ধরনের প্রত্যাশা এবং পরিবর্তনের আশার সঞ্চার ঘটেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের মতে, নির্বাচন শুধু ক্ষমতার বিনিময় নয়, এটি জনগণের আশা-ভরসার প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে, ভোটাররা উদ্দীপনা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মনোভাব নিয়ে নির্বাচনি প্রস্তুতিতে এগিয়ে আসছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিনের অবিচার, দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক চাপের পর এই নির্বাচন জনগণকে একটি নতুন সুযোগ দিতে পারে- যেখানে সরকারের জবাবদিহিতা এবং উন্নয়নমূলক কাজের বাস্তবায়ন মুখ্য।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের কার্যক্রম জোরদার করেছে। তারা আশা করছেন, জনগণ এবারের ভোটে তাদের রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং পরিবর্তনের আকাক্সক্ষা প্রমাণ করবে। নির্বাচনের আগের এই উত্তেজনা দেশের রাজনৈতিক পরিসরে এক নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে ধরা হচ্ছে।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ, রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক জীবনে উদ্বেগের বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা অর্থনীতির গতি শ্লথ করে দেয়। এসব বাস্তবতা একটি বড় শিক্ষা দেয়Ñ শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নয়, অর্থনীতির ভিত শক্ত করা জরুরি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ২০২৫ সাল ছিল উত্তেজনা, বিভাজন ও অবিশ্বাসের বছর। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, সহিংসতা এবং নানা অনিশ্চয়তা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্থিতিশীলতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক সংলাপের অভাব এবং দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার চরমীকরণ সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে, যা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশকেও প্রভাবিত করেছে।
২০২৫ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিও ছিল অস্থির। যুদ্ধ, বাণিজ্যিক টানাপোড়েন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। রপ্তানি বাজার সংকুচিত হয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাড়ে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হতে পারে ভবিষ্যতের পথনির্দেশ।
২০২৫ সালের আরেকটি বড় শিক্ষা সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির প্রশ্নে। দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও সেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষ বেড়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে- শুধু নীতি প্রণয়ন নয়, নীতির কার্যকর বাস্তবায়নই সবচেয়ে জরুরি। একই সঙ্গে তরুণ সমাজের অংশগ্রহণ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এসব অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাকে যদি সত্যিকার অর্থে কাজে লাগানো যায়, তবে ২০২৬ সাল হতে পারে ঘুরে দাঁড়ানোর বছর। অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফেরানো, ব্যাংকিং খাতে সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করলে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরতে পারে। রাজনীতিতে সহনশীলতা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে উঠলে স্থিতিশীলতা আসবে, যা উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
নতুন বছর মানেই অলৌকিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নয়। তবে নতুন বছর সুযোগ এনে দেয় আত্মসমালোচনার, ভুল থেকে শেখার এবং নতুন করে শুরু করার। ২০২৫ সাল আমাদের শিখিয়েছে কী করা উচিত নয় এবং কী করলে বিপদ ঘনীভূত হয়। সেই শিক্ষাকে ধারণ করে ২০২৬ সালে যদি সঠিক সিদ্ধান্ত, দায়িত্বশীল রাজনীতি ও মানবিক অর্থনীতির পথে এগোনো যায়, তবে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করা নিঃসন্দেহে অমূলক হবে না।
নতুন বছরের প্রাক্কালে তাই প্রত্যাশা একটাই- ২০২৬ হোক শিক্ষা থেকে প্রাপ্ত বোধের বাস্তব প্রয়োগের বছর, যেখানে সংকট নয়, সম্ভাবনাই হয়ে ওঠবে সময়ের প্রধান ভাষ্য।
কেকে/এমএ