জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রায়েরবাজারে গণকবরের ১১৪ জন শহীদের মরদেহ উত্তোলন শেষে ৮ জনকে শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। শনাক্ত কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানায় সিআইডি।
পরিচয় শনাক্তকারী শহীদরা হচ্ছেন— শহীদ কাবিল হোসেন (৫৪), শহীদ সোহেল রানা (৩৮), শহীদ আসাদুল্লাহ (৩১), শহীদ রফিকুল ইসলাম (২৯), শহীদ মাহিম (৩২), শহীদ ফয়সাল সরকার (২৬), শহীদ রফিকুল ইসলাম (৫২) ও শহীদ পারভেজ বেপারী (২৩)। এরা সবাই জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন।
জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং আদালতের নির্দেশে পরিচালিত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে ৯টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৮ জন শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। অবশিষ্ট মরদেহের পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বহু ব্যক্তির মরদেহ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে শহীদ পরিবারের দাবি ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে মরদেহ উত্তোলন ও শনাক্তকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। নিহতদের পরিচয় শনাক্তে আন্তর্জাতিক মান ও বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই সংবেদনশীল কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পায় সিআইডি। কার্যক্রমটির নেতৃত্ব দেন সিআইডি প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ।
এছাড়াও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন (ইউএইচসিআর)–এর সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপোলজিস্ট ও ফরেনসিক কনসালটেন্ট ড. লুইস ফনডেরিডার-এর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে মরদেহ উত্তোলন কার্যক্রম শুরু হয়।
সিআইডি জানায়, এর আগে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি মরিস ট্রিডবেল বিনজ, যিনি বিচারবহির্ভূত ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড বিষয়ক স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার, তিনি বাংলাদেশে এসে সিআইডির ফরেনসিক, ডিএনএ ও মেডিকেল ফরেনসিক টিমকে দুই দিনব্যাপী বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। মিনেসোটা প্রোটোকল অনুসরণ করে মরদেহ উত্তোলন, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, প্রোফাইলিং এবং পুনঃসমাধিস্থকরণ—সমগ্র প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্দেশিকা অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়েছে।
এই প্রোটোকল সম্ভাব্য বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর তদন্তে মানবাধিকার ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা হিসেবে স্বীকৃত। এদিকে, রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১৪টি মরদেহ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়। এই কার্যক্রমে সিআইডির পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করে।
সিআইডি আরও জানায়, রায়েরবাজারে পরিচালিত এই বৃহৎ পরিসরের ফরেনসিক কার্যক্রম বাংলাদেশে মানবাধিকারভিত্তিক তদন্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে শহীদ পরিবারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হয়েছে এবং ভবিষ্যৎ বিচারিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষিত হয়েছে। এই উদ্যোগ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও শহীদদের প্রতি রাষ্ট্রীয় শ্রদ্ধা জানানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন বলেও জানা গেছে।
শনাক্ত হওয়া ৮ শহীদের পরিচয় ও তাদের পেশা:
শহীদ কাবিল হোসেন (৫৮), পিতা মৃত বুলু মিয়া, ঠিকানা ৭/১৭ এ, মুগদা। তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তার মৃত্যুর তারিখ ২ আগস্ট। মৃত্যুর স্থান ছিল মাদারটেক, ঢাকা।
শহীদ সোহেল রানা (৩৮)। তিনিও একজন কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তার মৃত্যু ১৮ জুলাই। মৃত্যুর স্থান ছিল দক্ষিণ কাজলা, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।
শহীদ আসাদুল্লাহ (৩১)। মৃত্যুর তারিখ ২২ জুলাই। মৃত্যুর স্থান ৭ নম্বর সেক্টর, ২ নম্বর রোড, উত্তরা ঢাকা।। তিনি পেশায় একজন ড্রাইভার ছিলেন।
শহীদ রফিকুল ইসলাম (২৯)। মৃত্যুর তারিখ ১৯ জুলাই। মৃত্যুর স্থান যাত্রাবাড়ী। তিনি পেশায় একজন টাইলস মিস্ত্রি ছিলেন।
শহীদ মাহিম (৩২)। মৃত্যুর তারিখ ১৮ জুলাই। মৃত্যুর স্থান মোহাম্মদপুর। তিনি পেশায় একজন ড্রাইভার ছিলেন। তার দুজন স্ত্রী—একজনের নাম সুইটি, অন্যজনের নাম জেসমিন। দুই ঘরেই তার দুটি সন্তান রয়েছে।
শহীদ ফয়সাল সরকার (২৬)। মৃত্যুর তারিখ ২২ জুলাই। মৃত্যুর স্থান উত্তরা। তিনি পেশায় একজন ছাত্র ছিলেন। তার দুই ভাই ও ছয় বোন রয়েছে।
শহীদ রফিকুল ইসলাম (৫২)। মৃত্যুর তারিখ ১৯ জুলাই। মৃত্যুর স্থান গোলাপবাগ, যাত্রাবাড়ী। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক ও কম্পিউটার প্রশিক্ষক ছিলেন।
শহীদ পারভেজ বেপারী (২৩)। মৃত্যুর তারিখ ১৯ জুলাই। মৃত্যুর স্থান বাড্ডা, ঢাকা। তিনি পেশায় ফার্নিচার নকশা মিস্ত্রি ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে একাধিক শহীদ পরিবার রায়েরবাজার গণকবরে উপস্থিত ছিলেন, সন্তানের কিংবা ভাইয়ের কবরটি শনাক্ত হওয়ার আশায়।
শহীদ সোহেলের ভাই জানান, “আমাদের ভাইয়ের কবরটি শনাক্ত হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। এতদিন ধরে ভাইয়ের কবর কোথায় তা খুঁজতাম আর কান্না করতাম। কিন্তু আজ মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ভাইয়ের কবর পেয়ে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। আমার মা প্রতিদিন রায়েরবাজার গণকবরে এসে কান্না করত শুধু একটিবার ভাইয়ের কবরটা দেখার জন্য। আজ তার অবসান হলো।”
কেকে/ এমএস