‘গণতন্ত্র রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের ভূমিকা’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) অডিটোরিয়ামে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করে বলেন- গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ‘আয়নাঘর’-এর মতো গোপন নির্যাতন কেন্দ্র পরিচালনা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
বিলিয়া দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আইনের উপর গবেষণা ও সংলাপের জন্য একটি স্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে আসছে, যা আইনের শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এমন এক সময়ে যখন বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, বিশেষ করে ইউক্রেন-পরবর্তী এবং ভেনেজুয়েলার পরবর্তী ঘটনার পর, গণতন্ত্রের সুরক্ষা হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা করে বক্তারা।
এ সময় বাংলাদেশ, চিন, ইউক্রেন, ইন্ডিয়া, শ্রীলংকা ও কাশ্মীর নিয়েও আলোচনা হয়। এসব দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় আলোচনা করে বক্তব্য দেন বক্তারা।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় ল স্কুলের আন্তর্জাতিক আইনের প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. টম গিন্সবার্গ।
বিলিয়া চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. বোরহান উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অ্যাম্বাসেডর এম মারুফ জামান।
স্বাগত বক্তব্যে অ্যাম্বাসেডর এম মারুফ জামান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ২ হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্ব বরণ করার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরস্ত্র মানুষের ওপর সামরিক গ্রেডের মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। একটি বিশেষ কমিশন ইতিমধ্যে প্রায় দুই হাজার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তথ্য নথিবদ্ধ করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পরিচালিত ‘আয়নাঘর’ বা গোপন আটক কেন্দ্রগুলো ছিল ভিন্নমত দমনের এক আতঙ্কের নাম। ৫ আগস্টের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতায় নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মূল বক্তার বক্তব্যে অধ্যাপক টম গিন্সবার্গ গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং নির্বাচনী সততা রক্ষায় আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ ও গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র চ্যালেঞ্জের মুখে। এই অবস্থায় আইনের শাসন ও ক্ষমতার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক আইনকে রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ভিত্তি স্থাপনে এই আলোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
অনুষ্ঠানে উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইন বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকরা অংশগ্রহণ করেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বিলিয়ার সম্মানীয় সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন ড. মুহাম্মদ একরামুল হক। সবশেষে সভাপতির সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, বাংলাদেশে একটি টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা অপরিহার্য।
কেকে/ এমএস