যে বয়সে একটি শিশুর দিন কাটার কথা বই-খাতা আর খেলাধুলায়, সেই বয়সেই আট বছরের ইয়ামিনকে দেখতে হয়েছে জীবনের সবচেয়ে বিভীষিকাময় দৃশ্য। তার চোখের সামনেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন মা ফিরোজা বেগম ও বোন ফারজানা আক্তার রাত্রি। অভিযুক্ত দুলাভাই হৃদয় ইসলাম শিপন পরে নিজেই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।
আজ রোববার (২ আগস্ট) সকালে ঢাকা উত্তর সিটির কলাবাগানে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে একটি পরিবার।
ঘটনার সময় আতঙ্কে চিৎকার করছিল ইয়ামিন। পালিয়ে ছিল ছাদের এক কোনায়। মাকে ও বোনকে বাঁচানোর আকুতি জানালেও তার অসহায় কান্না থামাতে পারেনি হত্যাযজ্ঞ।
ঘটনার পর অভিযুক্ত হৃদয় ইসলাম শিপন নিজেই কলাবাগান থানায় গিয়ে হত্যাকাণ্ডের কথা জানান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ফারজানা আক্তার রাত্রির লাশ উদ্ধার করে এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে ফিরোজা বেগমের লাশ উদ্ধার করে।
কান্না জড়িত কণ্ঠে শিশু ইয়ামিন বলে, ‘আমার দুলাভাই আমার বোনকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল আর আমার মা নাস্তা রেডি করছিল। এ সময় আমার বোনের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে আমার সামনে রাত্রি আপুকে ও আম্মাকে কুপিয়ে আহত করলে আমি ভয়ে ছাদের চিপায় গিয়ে লুকিয়ে ছিলাম। কতক্ষণ পরে বের হয়ে দৌড়ে নিচে গিয়ে আমার খালাকে জানাই, পরে আমার বাবাকে জানাই। বাবা যখন উপরে যায় তখন আমি নিচেই ছিলাম। পরে মাকে আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) নিয়ে যাওয়া হয়।’
ফারজানা আক্তার রাত্রির বাবা ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমাদের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলায়। গত সপ্তাহে স্ত্রী ফিরোজা বেগম ও মেয়ে ফারজানা গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিল। আমার এক ভাতিজার বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে শিপনও সেখানে যান। তবে বিয়ের দিন সকালে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটি বিষয় নিয়ে ঝগড়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শিপন কোনো খাওয়া-দাওয়া না করেই ঢাকায় ফিরে আসেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘রাত্রির মা আমাকে জানায় মেয়ের সঙ্গে কী যেন ঝামেলা হয়েছে, পরে শিপন চলে গেছে। পরে আমি তাকে ফোন দিলে সে যাবে না বলে জানায় এবং বলে ‘আমাকে মালিক ফোন দিছে আমার ট্রিপ আছে, এ জন্য আমি চলে এসেছি।’ পরে জানতে পারি নেশাগ্রস্ত দুইজন বন্ধুকে নিয়ে বিয়ে বাড়িতে যাওয়ায় মেয়ের সঙ্গে শিপনের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর শিপন আমার মেয়ে ও স্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে বাসায় গিয়ে দেখি মেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে আছে। আর স্ত্রী ফিরোজা বেগম তখনও জীবিত ছিলেন, কাতরাচ্ছিলেন। মেয়েকে সেখানেই রেখে দ্রুত স্ত্রীকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন ‘
ফারুক হোসেন ‘বলেন, ‘পাঁচ-ছয় বছর আগে শিপন ও রাত্রির বিয়ে হয়। তারা দুইজনেই মোহাম্মদপুর থাকতো। পরে বিভিন্ন পারিবারিক বিষয় নিয়ে ঝামেলা হলে তাদের দুইজনের মধ্যে ডিভোর্স হয়। এরপর আমার বড় ভাই ভাবিকে ধরে তারা আবার নতুন করে বিয়ে করে। বিয়ের পর তাদের কোল জুড়ে আসে ছেলে সন্তান। বর্তমানে ওই ছেলের বয়স এক বছর দুই মাস। আমার কাছে এসে তার জন্য টাকা চাইলে আমি বলি এত টাকা কোথা থেকে দেব। এখন শিপন এ কাজ করল তার যে সন্তান রয়েছে, এই ছোট্ট শিশুটির এখন কী হবে।’
স্থানীয়রা জানান, স্ত্রী ও শাশুড়িকে খুনের পর শিপন তার ছোট সন্তানকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। পরে উপায়ান্তর না পেয়ে শিপন বাচ্চাসহ থানায় গিয়ে সারেন্ডার করে। পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে এবং রাত্রির লাশ উদ্ধার করে। ফিরোজা বেগম মারা যায় ঢামেক হাসপাতালে। তাদের শরীরে একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
এ ব্যাপারে কলাবাগান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফজলে আশিক বলেন, ‘আমরা জানতে পারি, পাঁচ-ছয় বছর আগে শিপনের সঙ্গে রাত্রির বিয়ে হয়। এর মাঝে একবার তাদের মধ্যে ডিভোর্সের ঘটনাও ঘটেছিল। রাত্রি ও শিপনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হলে সবসময়ই রাত্রির মা ফিরোজা বেগম মেয়ের পক্ষ নিতেন। আজও কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে শিপন সবজি কাটার ছুরি দিয়ে প্রথমে তার স্ত্রী ও পরে ফিরোজা বেগমকে এলোপাথাড়ি আঘাত করে। পরে সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় এবং রক্তাক্ত অবস্থায় থানায় গিয়ে নিজেই আত্মসমর্পণ করে। বর্তমানে শিপন আমাদের থানা হেফাজতে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিবারের লোকজন খবর পেয়ে ফিরোজা বেগমকে আহত অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এবং রাত্রি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আমরা সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটকে খবর দিলে তারা এসে আলামত সংগ্রহ করে। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে লাশ উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।’
কেকে/এমএ