বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। এরপর থেকে দেশে মোট ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তবে এবারের নির্বাচন নিয়ে রয়েছে একটি বড় ব্যতিক্রম—স্বাধীনতার ৫৫ বছরে এই প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ পোস্টারবিহীন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আচরণবিধি অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে সব ধরনের পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, রাস্তাঘাট, অলিগলি কিংবা পাড়া-মহল্লায় প্রার্থীদের রঙিন বা সাদাকালো কোনো পোস্টার চোখে পড়ছে না। অতীতের নির্বাচনে যা ছিল একটি পরিচিত ও দৃশ্যমান চিত্র।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকার ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পোস্টার না থাকায় অনেকেই প্রার্থীদের চিনতে পারছেন না। তাদের মতে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানেই ছিল একধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার, অলিগলিতে ঝুলন্ত ব্যানার দেখে এক ধরনের আনন্দ ও নির্বাচন আমেজ তৈরি হতো। কিন্তু এবার সেই চিত্র অনুপস্থিত। ভোটারদের ভাষ্য—এবারের নির্বাচন অনেকটাই সাদামাটা ও নিরানন্দ লাগছে।
পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় শুধু ভোটারদের মধ্যেই নয়, প্রভাব পড়েছে নির্বাচনকেন্দ্রিক একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকায়। অতীতে অনেক নিম্ন আয়ের মানুষ রাতভর দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার সাঁটানো, রশি টানিয়ে অলিগলিতে পোস্টার লাগানোর কাজে যুক্ত থাকতেন। এতে করে তাদের নিয়মিত আয় হতো এবং অনেক সময় রাজনৈতিক নেতাদের নজরেও আসতেন তারা। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই আয়ের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে ছাপাখানা শিল্প। ছাপাখানার মালিক ও শ্রমিকরা জানান, জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই সাধারণত পোস্টার ছাপানোর কাজে তাদের কারখানায় ব্যস্ততা বেড়ে যেত। কিন্তু এবার নির্বাচন শুরু হলেও তাদের হাতে কোনো পোস্টার ছাপানোর অর্ডার নেই। অনেক মালিক আগেভাগেই কয়েক লাখ টাকার কাগজ কিনে ফেলেছেন, যা এখন অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে শত কোটি টাকার পোস্টার ছাপানোর ব্যবসা হতো, তা এবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অতীতে প্রতিটি সংসদীয় আসনে ন্যূনতম এক হাজার থেকে বারো’শ মানুষ নির্বাচনকালীন বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকতেন। ওয়ার্ডভিত্তিক প্রচারণায় এক থেকে দেড়শ ভ্যানগাড়ি ব্যবহার হতো। প্রতিটি ভ্যানে তিন থেকে চারজন করে কর্মী রাতভর পোস্টার সাঁটানোর কাজে নিয়োজিত থাকতেন। এতে প্রার্থীদের দৈনিক নির্দিষ্ট খরচ হলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস। এবারের নির্বাচনে সেই আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
তবে পোস্টার না থাকায় একটি ইতিবাচক দিকও দেখছেন অনেক বাসিন্দা। তাদের মতে, দেয়াল ও পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক বেশি পরিচ্ছন্ন থাকছে, যা স্বস্তিদায়ক। যদিও একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক বহু পেশাজীবী ও শ্রমজীবী মানুষ।
কেকে/ আরআই