রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আবারও কিশোর গ্যাংয়ের তান্ডব। এবার জমি দখলে নিতে হামলা চালিয়ে ১৫টি ঘরের জানালা-দরজা, ভাড়াটিয়াদের জিনিসপত্র—এমনকি ঘরের টিনের চালও খুলে নিয়ে গেছে তারা। লুটপাট শেষে এক পুলিশ অফিসারের নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে তারা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এক সাংবাদিক ও কিশোর গ্যাং লিডাররা মিলে বাড়ি দখলের পাঁয়তারা করছে। তারা আইনের তোয়াক্কা করছে না।
জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুর ১২টা ৪২ মিনিটের দিকে মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানের প্রধান সড়ক ধরে এগিয়ে যায় প্রায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। কিছু দূর এগিয়ে দেশিয় অস্ত্র হাতে সবাই প্রবেশ করে ঢাকা উদ্যান এলাকার ৩৯ নম্বর প্লটে। শুরু হয় তাণ্ডব। ভাড়াটিয়াদের আসবাবপত্র ও বাসার জানালা দরজা খুলে নিয়ে যায় অস্ত্র দেখিয়ে। পুরো বাড়িটি লুটপাট করা হয়। এমনকি টিনের চাল পর্যন্ত খুলে নেয় কিশোর গ্যাং।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ঢুকেই হামলা ভাংচুর শুরু করে। মারধর করে ভাড়াটিয়াদের। শুধু হামলা ভাংচুর করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা। লুটপাট করেছে সবকিছু।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৫টি রুমের জানালা-দরজা, ভাড়াটিয়াদের আসবাবপত্র, এমনকি টিনের চালও খুলে নিয়ে গেছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।
লুটপাটের এই দৃশ্য আশপাশের সিসি টিভি ক্যামেরাগুলোতেও ধরা পড়েছে। দেখা গেছে, কেউ মাথায়, কেউ অটোরিকশা করে মালামাল লুট করে নিয়ে যাচ্ছে।
ভাংচুর ও লুটপাট শেষে একজন ব্যক্তির নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে তারা। সাইনবোর্ড দাবি করা হয়েছে, ওই ব্যক্তি পুলিশের বড় কর্তা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, জমি দখলে নিতেই হামলা-ভাংচুর করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের। যার নেপথ্যে রয়েছে সাংবাদিক এনামুল হক এনাম।
ভুক্তভোগীদের এই অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে ভিডিও ফুটেজে। দেখা গেছে, হামলা-ভাংচুরের সময় ৯৯৯ নাইনে কল পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। তবে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা। উল্টো ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ নিয়েছে পুলিশ।
হামলার ভিডিও ফুটেজে আরও দেখা যায়, কয়েকটি কিশোর গ্যাং একসাথে এই হামলা ও লুটপাটে জড়িত। এদের মধ্যে অন্যতম কব্জি কাটা আনোয়ারের ভাই দেলোয়ার গ্রুপ। এছাড়া, মহিদুল, কাউসার ও ইমনকে হামলার নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।
এরা সবাই কিশোর গ্যাং লিডার রাফাত গ্রুপের সদস্য। এই রাফাত মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের এক নেতার লোক। সাংবাদিক এনামুল হক এনাম এদের সবাইকে ভাড়া করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, এছাড়াও পুলিশের যে কর্মকর্তার নামে সাইনবোর্ড ঝোলানা হয়েছে, তার বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে এনামুল হক এনাম মুঠোফোনে বলেন, ‘এই জমি আমার কেনা।’
পুলিশ কর্মকর্তার নামে সাইনবোর্ড কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই পুলিশ কর্মকর্তাসহ আমরা জমিটি কিনেছি।’
আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে কিভাবে জমিনটি দখল করতে গেলেন—এমন প্রশ্নে এনামুল হক বলেন, ‘যেহেতু জমি কিনেছি, সেক্ষেত্রে আমরা নিজেরাই জমি দখল নিব।’
স্থানীয়রা জানান, এলাকায় জমি দখল নিয়ে মাঝেমাঝে সংঘর্ষ ঘটে। এক জমির মালিকানা দাবি করে করে ৩-৪ জন। এই জমিনটি মালিকানা দাবি করে দুইজন। আবার আরো একজন রয়েছে বায়না সূত্রে মালিক। এখানে একজনের দখলে অন্য জন আসে দলবল নিয়ে দখল নিতে। একই জমির ২-৩ জন মালিকানা দাবি করে থাকে। মূলত এ জন্যই এই এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিষয় মারামারি হয়ে থাকে। এই জমিনটি একজনের দখলে রয়েছে অনেক বছর পর্যন্ত। তাদেরও হয় তো সেরকম পেপার রয়েছে। আবার হঠাৎ করে একজন এসে বলছে, এই জমি তিনি কিনেছি। এসব বিষয় নিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা আরো বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এসব বিষয়ে আরো কঠোর হওয়া দরকার। জমির মালিক যে-ই হউক, সেজন্য আইন আদালত রয়েছে। এভাবে লুটপাট তো করতে পারে না।
এদিকে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, ‘এ বিষয়ে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওআ হবে।’
কেকে/এমএ