রাজধানীর মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যান এলাকায় পানির পাম্প সংলগ্ন খলিল মেডিকেল হল নামে একটি প্রতিষ্ঠানে খতনা করাতে গিয়ে ৯ বছর বয়সী এক শিশুর গুরুতর শারীরিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে এক কথিত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি, দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চিকিৎসাকেন্দ্রটির কার্যক্রম তদন্তের আবেদন করা হয়েছে থানায়। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাতে কথিত ডাক্তার খলিলকে আটক করেছে থানা পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় একটি মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ভোলার লালমোহন উপজেলার চর সকিনা গ্রামের বাসিন্দা মো. আব্দুল মান্নান গত ২২ মার্চ সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে তার নাতি আতিকুর রহমানকে সুন্নতে খতনা করানোর জন্য ‘খলিল মেডিকেল’ নামে একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান।
পরিবার জানায়, স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণা থাকায় সেখানে শিশুটিকে নেওয়া হয়।
পরিবারের অভিযোগ, খতনা করার দায়িত্বে থাকা কথিত ডাক্তার খলিল চিকিৎসায় মারাত্মক অবহেলা করেন। খতনার সময় অসাবধানতা ও অদক্ষতার কারণে শিশুটির পুরুষাঙ্গের সামনের অংশ (গ্ল্যান্স পেনিস) কেটে যায়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং শিশুটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ঘটনার পরপরই পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে শিশুটিকে দ্রুত অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি চিকিৎসার মাধ্যমে রক্তপাত বন্ধ করা সম্ভব হলেও শিশুটির শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং ভবিষ্যৎ জটিলতা নিয়ে পরিবার চরম উদ্বেগে রয়েছে।
চিকিৎসকরা পরবর্তী চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, এ ঘটনায় শিশুটির স্বাভাবিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভবিষ্যতে শারীরিক ও মানসিক জটিলতার আশঙ্কা রয়েছে বলেও তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো ধরনের দায় স্বীকার করেননি। বরং ক্ষতিপূরণ দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং উল্টো হুমকি-ধমকি দিয়ে তাদের চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে বের করে দেন। এতে পরিবারটি আরও অসহায় হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে মো. আব্দুল মান্নান মোহাম্মদপুর মডেল থানায় লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন। আবেদনে তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, শিশুটির চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন এবং ভবিষ্যৎ জীবনের ক্ষতির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের দাবি জানিয়েছেন।
থানা সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, বিষয়টি মামলা হিসেবে গ্রহণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। এছাড়াও অভিযুক্ত খলিলকে গতকাল রাতে আটক করে পুলিশ।
এদিকে, স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ‘খলিল মেডিকেল’-এ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
সেখানে ডেন্টাল চিকিৎসার সাইনবোর্ড থাকলেও কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ তদারকি ছাড়াই পরিচালিত হয়ে আসছে।
আরও কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ওই প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ওষুধ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স, চিকিৎসা সেবা ও জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা মান যাচাই করা দরকার।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘দেশে অনুমোদনহীন ক্লিনিক, অদক্ষ কর্মী এবং ভুয়া চিকিৎসকদের কারণে সাধারণ মানুষ নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সামান্য চিকিৎসা অবহেলাও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এদিকে শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সমাজসেবা অধিদপ্তরের এক নারী কর্মী বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। শিশুটি বাসা পরিদর্শন করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ভুক্তভোগী শিশুর পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও আইনি সহযোগিতা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শিশুটির চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় সহায়তায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর কাজ করবে।’
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকাজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে অবৈধ চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর দাবি জানিয়েছেন।
কেকে/এমএ