মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬,
৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
শিরোনাম: সুশাসন ও সংস্কার ছাড়া বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন      দেশজুড়ে কঠোর সতর্কতা      চীনের দালিয়ানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      চীন পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী      ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তেল রপ্তানিতে সুখবর      এবার পাঁচ জেলায় বিজিবি মোতায়েন      ভূমিকম্পে কাঁপলো রাজধানী      
রাজধানী
সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে ঝরল আরেক মেধাবী প্রাণ
নিজাম উদ্দিন
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১০ পিএম আপডেট: ২৯.০৪.২০২৬ ৬:০৯ পিএম
অভিযুক্ত তাহমিদ ও রিসিকা (বাঁ থেকে)

অভিযুক্ত তাহমিদ ও রিসিকা (বাঁ থেকে)

রাজধানীর শ্যামলীতে কলেজছাত্রীর রহস্যজনক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। পরিবারের অভিযোগ সহপাঠীর ব্ল্যাকমেইল ও মানসিক নির্যাতন। এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমেছে শ্যামলী ২ নম্বর রোডের বাসিন্দাদের মধ্যে।

বাংলাদেশে সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল ও ডিজিটাল হয়রানি দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও শিক্ষার্থীদের জীবনে এর প্রভাব হয়ে উঠছে মারাত্মক। অনলাইন সম্পর্ক, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে হুমকি, সামাজিক অপমানের ভয় এবং মানসিক চাপ এসব কারণে অনেক তরুণ-তরুণী চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। বছরে ১৩ হাজারের অধিক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করলে দেখা যায় বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৩ হাজার থেকে ৬৪ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৫০ জন, যার অর্থ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৬ জন।

শিক্ষার্থী ও ব্ল্যাকমেইল : শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার একটি বড় কারণ সামাজিক ও ব্যক্তিগত হয়রানি বা ব্ল্যাকমেইল। ২০২৩ সালে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে—যার মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি নারী। আত্মহত্যার কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রেমে প্রতারণা, অনলাইন হয়রানি, ও ব্যক্তিগত ছবি/ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী দেখা যায়, ২০২৫ সালে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শ্যামলীর ২ নম্বর রোডের বাসিন্দা মেধাবী কলেজছাত্রী রিসিকা প্রাণ হারান। তিনি ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের মোহাম্মদপুর শাখা থেকে একাদশ শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী ছিলেন। 

পরিবারের অভিযোগ, সহপাঠীর দীর্ঘদিনের ব্ল্যাকমেইল, ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি এবং মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ তারিখ শ্যামলীর ২ নম্বর রোডের নিজ বাসায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন রিসিকা। একমাত্র মেয়ের এমন মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রবাসে থাকা বাবা স্তব্ধ—মা শোকে পাথর।

কলেজছাত্রী রিসিকা

কলেজছাত্রী রিসিকা


পরিবারের দাবি, ঘটনার মূল অভিযুক্ত রিসিকার সহপাঠী ও একই কলেজের ছাত্র তাহমিদ। নবম শ্রেণি থেকে তাদের পরিচয় থাকলেও পরে তাহমিদ মাদক ও গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ায় রিসিকা সম্পর্ক থেকে সরে আসতে চেয়েছিলেন। এরপর থেকেই ব্যক্তিগত কিছু ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ পরিবারের।

রিসিকার মৃত্যুর পর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে অভিযুক্ত তাহমিদ ও তার মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলেছে রাসিকার পরিবার। অভিযুক্তের মা একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেও জানা গেছে।

নিহতে রিসিকর মা শামস সুলতানা রুমি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার মেয়ের সব স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে ওরা। আমি কোনো আপস চাই না, আমি বিচার চাই। আমার একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি।” 

তিনি বলেন, “একমাত্র সন্তানকে বুকে নিয়ে বেঁচে ছিলাম, আর কোনো সন্তান নেই। কত কষ্ট করে এই সন্তানকে মানুষ করেছি, আজ আমার সব শেষ। আমি কি নিয়ে বাঁচব।”

সুদূর আমেরিকা প্রবাসী বাবাও জানিয়েছেন, তিনি এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান, যাতে আর কোনো মেধাবী মেয়েকে এভাবে অকালে ঝরে যেতে না হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রিসিকা ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ক্যামব্রিয়ান স্কুল মোহাম্মদপুর শাখা থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে বিরক্ত ও হয়রানির কারণে তাকে উত্তরা মাইলস্টোন কলেজে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি।

নিহতের মামা মোরশেদ আলম কিরণ বলেন, “আত্মহত্যার আগের রাতে রাত ১১টার দিকে ভাগ্নীর সঙ্গে শেষ কথা হয়। পরদিন কলেজ বন্ধ থাকায় দুপুর পর্যন্ত তাকে ডাকাডাকি করা হয়নি। পরে বিকেল ৩টার দিকে সন্দেহ হলে বাড়ির পেছন দিক থেকে জানালা দিয়ে দেখা যায়, ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছেন রিসিকা। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জানান, ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “রিসিকার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ভিসা প্রসেস চলছিল। গত মাসেই তিনি মার্কিন দূতাবাসে গিয়েছিলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো নতুন জীবনের পথে পা রাখতেন। কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।”

পরিবারের দাবি, আত্মহত্যার আগে রিসিকা অভিযুক্ত তাহমিদকে ভিডিও কল করেছিলেন। এমনকি অভিযুক্তের কাছে পরিবারের সদস্যদের ফোন নম্বরও ছিল। কিন্তু তিনি কাউকে কিছু জানাননি। বরং একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনার দিন সকাল ৫.৩৭ মিনিটে অভিযুক্ত তাহমিদ বাসার সামনে ঘোরাঘুরি করেছিল। কিন্তু নিহতের পরিবারের কাউকে জানায়নি। ঘটনাটি পরিবারের কাউকে জানালে হয়তো মেয়েটিকে বাঁচাতে পারতো বলেও অভিযোগ পরিবারের।

শ্যামলীর স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একটি মেধাবী শিক্ষার্থী কতটা মানসিক যন্ত্রণায় থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বোঝেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া উচিত।

সচেতন মহলের মতে, ডিজিটাল যুগে সাইবার বুলিং এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা সম্পর্ককে হাতিয়ার বানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করা শুধু অপরাধ নয়, এটি মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। তাই দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা, পরিবারে সচেতনতা এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মনোসামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি। রিসিকার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়—এটি সমাজের জন্যও বড় সতর্কবার্তা। আর কত স্বপ্ন ঝরে গেলে আমরা জাগব?

এ বিষয়ে শেরেবাংলা নগর থানার উপ পরিদর্শক এসআই মাহাবুব খোলা কাগজকে বলেন, “এই ঘটনায় আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে আসছি ভুক্তভোগী পরিবারকে, মেয়েটি আত্মহত্যা করলেও কি কারণে এমন করেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় মেয়েটির মোবাইলের তথ্য সিআইডির ফরেনসিক বিভাগে পাঠানোর কাজ চলমান রয়েছে।”

কেকে/এজে




আরও সংবাদ   বিষয়:  সাইবার বুলিং   ঝরল মেধাবী প্রাণ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

রাজধানী- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close