মৌলভীবাজার জেলার চা শিল্পাঞ্চলে টানা বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চা শিল্প চরম সংকটে পড়েছে। টানা কয়েক দিনের লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় উৎপাদন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে গেছে।
সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে জেলার অধিকাংশ চা কারখানা বন্ধ রয়েছে। এতে করে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চা পাতা প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে কাঁচা পাতা নষ্ট হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাগানগুলোতে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চা পাতা মজুদ থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তা প্রক্রিয়াজাত করা যাচ্ছে না। এতে প্রায় লাখ লাখ কেজি পাতা পচে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলার এনটিসির পাত্রখোলা, মাধবপুর, কুরমা, চাম্পারায় ও মদনমোহনপুর চা বাগানে সম্প্রতি উত্তোলিত আড়াই লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা ইতোমধ্যে বিনষ্ট হয়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়া গেলে এগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ৬০ হাজার কেজি তৈরি চা হতো।
চা বাগান সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উৎপাদন বন্ধ থাকায় ইতোমধ্যে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। শুধু জেলার পাঁচটি সরকারি চা বাগানেই প্রাথমিকভাবে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তীব্র বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারনে চা-বাগানগুলোতে একদিকে কাঁচা পাতা বিনষ্ট হয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
এনটিসি, ডানকান ব্রাদার্স, চা বোর্ড ও দেউন্দি টি কোম্পানিসহ ব্যক্তি মালিকানাধীন ও ফাঁড়ি বাগান মিলিয়ে ২২টি চা বাগান রয়েছে। তবে সম্প্রতি মারাত্মক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে চা বাগানগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত ও ক্ষতির মুখে পড়েছে। চা প্রক্রিয়াজাত করার ধাপগুলোর সময় সংবেদনশীল থাকায় পাতা তোলার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়াজাতকরণ কাজ না হলে চায়ের স্বাভাবিক স্বাদ ও গন্ধ নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই বিদ্যুৎ বিভ্রাট সরাসরি উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
এনটিসির বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ একেবারেই কমে আসে। ২৫-২৯ এপ্রিল পর্যন্ত গড়ে সাড়ে ৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। এতে চা কারখানাগুলোতে উৎপাদনে মারাত্মক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। চা বাগানগুলোতে প্রচুর পরিমাণে কাঁচা চা পাতা উত্তোলিত হলেও তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে সময়মতো প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উত্তোলিত কাঁচা পাতার বৃহৎ অংশ বিনষ্ট হচ্ছে।
এ বছর চা পাতার ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দিনের প্রায় ২০-২১ ঘন্টা বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানার মেশিনের রোলার বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে কাঁচা পাতা সংগ্রহের পর দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না, আর এতে পাতা পচে যাচ্ছে বা মান হারাচ্ছে।
গত সোমবার (২৭ এপ্রিল) অকশনের পূর্বের উৎপাদিত পাঁচ চা বাগানের ৫১ হাজার কেজি চা পাতা বিক্রি হয়। যার মূল্য আসে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ভালোভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ হলে আরো অধিক চা পাতা বিক্রি করা যেতো।
অন্যদিকে চা শ্রমিকদের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। টানা পাঁচ দিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় হাজার হাজার শ্রমিক আয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, যা তাদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে।
ন্যাশনাল টি কোম্পানির মাধবপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক দিপন কুমার সিংহ বলেন, ‘সরকারি ৫টি চা বাগানে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। বাগানগুলোতে মজুদ রয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা; যেখান থেকে উৎপাদনের কথা ছিল প্রায় ৬০ হাজার কেজি চা। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটে সেই কাঁচা পাতাগুলোই এখন পচে নষ্ট হচ্ছে। এতে করে চা শিল্পে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। ক্ষতির মুখে পড়ছে সরকার। এতে কমছে রাজস্ব আয়।’
পাত্রখলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. ইউসুফ খাঁন বলেন, ‘এপ্রিলের শুরু থেকেই প্রতিদিন ৫-৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছিল। কিন্তু ২৬ এপ্রিল থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বর্তমানে দিনে মাত্র ১-২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার কেজি কাঁচা চা পাতা মাচায় পড়ে রয়েছে, যা দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।’
কমলগঞ্জ পল্লী বিদ্যুতের মাধবপুর ইউনিটের ইনচার্জ মো. রহমতউল্লা বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঝড় ও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে এবং দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।’
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান জানান, ‘পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত গাছপালার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সচল করা হয়েছে এবং দ্রুতই সব চা বাগান এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।’
কেকে/এমএ