দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে নতুন অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত অগ্রগতি না থাকায় এখন তীব্র গ্যাস সংকটের মুখোমুখি হয়েছে দেশ। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ কমে আসলেও নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। ফলে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানার চাহিদা মেটাতে দেশকে ক্রমেই ব্যয়বহুল আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
দেশের জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলএনজি আমদানিনির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। কারিগরি ত্রুটির কারণে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরকারকে জরিমানা পরিশোধ করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক অনেক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হওয়ায় সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
তারা জানান, প্রায় আট বছর আগে দেশে এলএনজি ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। তবে একই সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব না দেওয়ায় বর্তমানে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে দৈনিক ৩৫০ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে দেশীয় উৎস থেকে এর অর্ধেকেরও কম সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি চাহিদা পূরণে ব্যয়বহুল এলএনজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যার দাম দেশীয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্যাসের যৌক্তিক বণ্টন বা রেশনালাইজেশন ছাড়া সংকট মোকাবিলা কঠিন। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্প-কারখানাকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দেন তারা। যদিও সরকার নতুন আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে, তবে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে শুধু আমদানি সক্ষমতা বাড়িয়ে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব হবে না বলেও তারা সতর্ক করেন।
জানা গেছে, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বয়লার বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর। দুর্ঘটনার পরপরই নিরাপত্তাজনিত কারণে টার্মিনালটির কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে টার্মিনালটি জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থায় কোনো এলএনজি সরবরাহ করতে পারছে না।
এ টার্মিনালটি দেশের অন্যতম প্রধান এলএনজি পুনর্গ্যাসীকরণ কেন্দ্র হওয়ায় এর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক খাতে গ্যাস সরবরাহে ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর রপ্তানিমুখী শিল্প, যেমন টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক খাত উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশীয় অনুসন্ধানে দীর্ঘসূত্রতা, গভীর সমুদ্র ও স্থলভাগে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব, নতুন কূপ খননে ধীরগতি এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে বর্তমান সংকট সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার কারিগরি ক্ষতি এবং অবৈধ ব্যবহারও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
তাদের মতে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, যেখানে একদিকে দেশীয় উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাহিদা অব্যাহতভাবে বাড়ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এলএনজি আমদানি অব্যাহত রাখা, বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ, নতুন কূপ খনন, অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করার কথা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গতকাল রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে মন্ত্রী মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক গ্যাসের বেশ চাহিদা বিদ্যমান। উক্ত চাহিদা নিরসনে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহের বিষয়ে বাংলাদেশ বিশেষ আগ্রহ প্রকাশ করছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়র সূত্র বলছে, ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই গ্যাস সংকট মোকাবিলাকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে বর্তমান সরকার। তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহ ঘাটতি কমাতে এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। চলতি বছরে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকেও অতিরিক্ত এলএনজি কার্গো আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা যায়।
এ ছাড়া সরকার দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে বাপেক্সের মাধ্যমে নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন, পুরোনো কূপের ওয়ার্কওভার এবং সম্ভাবনাময় এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, রক্ষণাবেক্ষণ জোরদার এবং কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সীমিত গ্যাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রপ্তানিমুখী শিল্প ও সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, একসময় দেশের গ্যাস চাহিদার প্রায় পুরোটা দেশীয় উৎপাদন থেকেই পূরণ হতো। কিন্তু পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকলেও অনুসন্ধান, কূপ খনন ও নতুন মজুদ আবিষ্কারের গতি সেই তুলনায় বাড়েনি। এর ফলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়েছে। বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু করে। পরবর্তী সময়ে সরকার আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তিও করে। এতে তাৎক্ষণিক সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দেশীয় উৎপাদন না বাড়ায় আমদানিনির্ভরতা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ প্রায় ৭.৯ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, এলএনজি কখনোই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের বিকল্প হতে পারে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি থাকায় আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে কাতার থেকে বাংলাদেশে নির্ধারিত এলএনজি সরবরাহও কমে যাওয়ার ঘটনা সেই ঝুঁকিকেই সামনে এনেছে।
এদিকে দেশের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কয়েক বছর ধরেই ধারাবাহিকভাবে কমছে। বিশেষ করে বিবিয়ানা, তিতাসসহ পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় প্রতিদিনের সরবরাহ কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা নতুন কোনো সরকারের আমলে শুরু হয়নি; বরং দীর্ঘদিনের উৎপাদন হ্রাসের ধারাবাহিক ফল এখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গতকাল রোববার রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা প্রফেসর রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেছেন, দেশে গ্যাস সংকট ও গৃহস্থালির জ্বালানি সমস্যার সমাধানে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। তিনি বলেন, অলিগার্কি ভাঙা, এলপিজির ব্যবহার বাড়ানোসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এসবের চেয়েও সহজ একটি সমাধান হতে পারত, যদি বাড়িতে রান্নার জন্য সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চুলার ব্যবস্থা করা যেত।
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেছেন, অতীত সরকারের আমলে যেভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো নেওয়া হয়েছিল, সেসব জায়গায় যেভাবে পর্যালোচনা হওয়া দরকার ছিল এবং পরিবর্তন আনা দরকার ছিল, সেটি হয়নি। সেই ধারাবাহিকতাই চলছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেছেন, দেশের গ্যাস সংকট নতুন কোনো সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের। সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত যথাসময়ে নেওয়া না হওয়ায় সংকটটি আজ আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
কেকে/এলএ