দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলে শীর্ষস্থান ধরে রাখার রহস্য শুধু প্রতিভা নয়, নিজেকে বারবার নতুনভাবে গড়ে তোলার ক্ষমতা। কিশোর উইঙ্গার থেকে ফলস নাইন, সেখান থেকে প্লেমেকার ও বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক—প্রতিটি ধাপে নিজের খেলাকে নতুন রূপ দিয়েছেন মেসি। আর সেই বিবর্তনের গল্পই তাকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
২০০৩ সালে বার্সেলোনায় অভিষেক হওয়া মেসি আর আজকের মেসির মধ্যে অনেক পার্থক্য। গত দুই দশকে তিনি শুধু একজন তারকা হননি, বারবার নিজের খেলার ধরন বদলেছেন। বেশিরভাগ খেলোয়াড় সময়ের সঙ্গে ফর্ম হারান, কিন্তু মেসি নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করে গেছেন। তিনি শুধু মানিয়ে নেননি, বরং খেলায় আধিপত্য বজায় রাখতে নিজের স্টাইল বদলেছেন।
১৬ বছর বয়সে মেসি প্রথম দিকে হোসে মরিনহোর পোর্তোর বিপক্ষে ডান প্রান্তে খেলতেন। তিনি ড্রিবল করতেন, ভেতরে ঢুকে আক্রমণ সাজাতেন। তখন থেকেই তার প্রতিভা সবাই বুঝতে পারে। রোনালদিনহো প্রথমবার মেসিকে অনুশীলনে দেখে বলেছিলেন, সে একদিন বিশ্বের সেরা হবে। পরে ২০০৫ সালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে তিনি বিশ্বকে চমকে দেন।
২০০৮ সালে পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার দায়িত্ব নেন। তিনি বুঝতে পারেন মেসিকে উইংয়ে আটকে রাখা ঠিক নয়। তিনি মেসিকে ধীরে ধীরে মাঝমাঠে এনে ফলস নাইন ভূমিকায় খেলাতে শুরু করেন।
২০০৯ সালে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে এই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়। মেসি তখন শুধু গোল করেন না, পুরো খেলা পরিচালনা করেন। সেই ম্যাচে বার্সেলোনা ৬-২ গোলে রিয়াল মাদ্রিদকে হারানোর পর বিশ্ব ফুটবল এক নতুন মেসিকে আবিষ্কার করে, যাকে থামানোর কোনো স্পষ্ট সমাধান ডিফেন্ডারদের হাতে ছিল না। ২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে মেসি ৬৯টি লা লিগা ম্যাচে ৯৬ গোল করেন।
তবে, ২০১৫ সালে জাভি এবং ২০১৮ সালে ইনিয়েস্তা বার্সেলোনা ছাড়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মেসিকে শুধু গোলদাতা নয়, পুরো দলের চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে হয়। তিনি আবার নিজেকে বদলান। ফলস নাইন থেকে আরও নিচে নেমে প্লেমেকারের দায়িত্ব নেন। গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
২০১১ সালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হওয়ার পর শুরু হয় নতুন নাটকীয়তা। মেসিকে একের পর এক হতাশার মুখোমুখি হতে হয়। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে পরাজয়, তিন বছরে তিনটি ফাইনাল হার তাকে এতটাই বিপর্যস্ত করেছিলো যে ২০১৬ সালের পর তিনি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। যদিও পরে ফিরে আসেন, কিন্তু তখন তিনি ভিন্ন মানুষ। আগের নীরব মেসির জায়গায় দেখা যায় আক্রমণাত্মক এক নেতাকে। ২০২১ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটায়। সেই সাফল্য মেসির জন্য মুক্তির অনুভূতি নিয়ে আসে। যা পরে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে গিয়ে এক মহাকাব্যিক রূপ নেয়।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে যোশকো গভার্দিওলকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছিল তরুণ উইঙ্গার মেসির স্মৃতি। আবার ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে নিখুঁত পাস, বুদ্ধিদীপ্ত মুভমেন্ট ও চাপের মুহূর্তে পেনাল্টি, সবই ছিল অভিজ্ঞ প্লেমেকারের পরিচয়।
বর্তমানে, ইন্টার মায়ামি এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকায় মেসিকে আগের তুলনায় অনেক কম দৌড়াতে দেখা গেছে। সমালোচকেরা একসময় এটিকে দুর্বলতা মনে করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলে গেছে। এখন অনেকের চোখে এটি এক অনন্য দক্ষতার প্রতিচ্ছবি, তিনি খেলার ভেতরটা আগেভাগেই পড়ে ফেলেন, শক্তি জমিয়ে রাখেন, আর ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে এসে ম্যাচের রংটাই বদলে দেন।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে মেসির অর্জন শুধু ট্রফি বা পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি একজন ফুটবলারের বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের গল্প। ফাবিও ক্যাপেলোকে মুগ্ধ করা কিশোর উইঙ্গার, ইউরোপীয় ফুটবলের কৌশল বদলে দেওয়া ফলস নাইন, অন্যদের উজ্জ্বল করে তোলা প্লেমেকার, বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক এবং এখন প্রায় না-দৌড়ানো অভিজ্ঞ নেতা—সব মিলিয়ে মেসির ক্যারিয়ার এক অনন্য বিবর্তনের নাম।
কেকে/এলএ