কথা ছিল ঋণের টাকা শোধ করলেই মামলা প্রত্যাহার করে নেবে এনজিও কর্তৃপক্ষ। এ জন্য খামারীর কাছ থেকে পুরো টাকা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঋণ শোধ করার পর এনজিও বলছে, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় খামারিকে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’ এ কারণে ঋণের টাকা শোধ করেও খামারি শামসুর রহমানকে (৭৪) আজও আদালতে উপস্থিত হতে হচ্ছে।
জয়পুরহাটের কালাই পৌরশহরের পাঁচশিরা বাজার এলাকায় এ ঘটেছে।
শামসুরের বাড়ি পাঁচশিরা বাজারে। হয়রানি থেকে রেহাই পেতে তিনি বিভিন্ন মহলে দ্বারস্থ হয়েছেন। কিন্তু কোনো উপকার পাননি।
শামসুর রহমান জানান, ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখা থেকে তার পোলট্টি খামারের বিপরীতে ৩ লাখ টাকা ঋণ নেন। সেই টাকায় ব্রয়লার মুরগীর বাচ্চা কিনে খামারে লালন-পালন করে আসছেন। হঠাৎ করে করোনার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়ে। গুজব ওঠে ব্রয়লার মুরগি খেলে ক্যান্সার রোগ বেড়ে যাবে। সে কারণে জীবিত দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের মুরগীগুলো মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখেন। এতে তিনি আর্থিকভাবে প্রায় নিঃশ্ব হয়ে পড়েন।
তারপরও ঋণের টাকা নেওয়ার পর প্রথম দিকে মাসিক কিস্তি ২৮ হাজার ৫০০ টাকা করে দিলেও পরবর্তী শামসুর রহমান যখন যা পারছেন, সেই পরিমাণ দিয়ে আসছেন। একপর্যায়ে তিনি ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হন। বিষয়টি এনজিও কর্তৃপক্ষকে জানালেও তার নামে ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মামলা করা হয়।
তখন এনজিওর মোট দাবি ছিল এক লাখ ২২ হাজার টাকা।
খামারি শামসুর রহমান আরও জানান, মামলার পর এনজিওর তৎকালিন ক্রেডিট অফিসার অজিত রায় ২০২৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৫ হাজার টাকা কিস্তি নিয়ে যায়। ওই বছরের অক্টোবর মাসেও ৫ হাজার টাকা কিস্তি দেন তিনি। এরপর আদালত থেকে মামলার নোটিশ পান। তখন তিনি এনজিওর ব্যবস্থাপক ও সিওর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তারা বলেছিলেন, ঋণ শোধ করলে মামলা প্রত্যাহার করে নেবেন। আর সুদের টাকা মাফ করে দেবেন। এ জন্য তিনি সম্পত্তি বন্ধক রেখে মূল পাওনার টাকা পরিশোধ করেন। তখন এনজিও ২ লাখ ৮৯৪ টাকার দাবিতে মামলা করেছিল। পরে ওই বছরের ৩০ নভেম্বর নগদ ৬৫ হাজার এবং সঞ্চয় মিলে তার কাছ থেকে ৭১ হাজার ২০০ টাকা আদায় করা হয়। এনজিওর ব্যবস্থাপক ওই টাকা আদালতের মাধ্যমে না নিয়ে সরাসরি পাশ বইয়ের মাধ্যমে জমা নেন। কিন্তু এখনো মামলা প্রত্যাহার করেনি। এ কারণে তিনি বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
এখন শামসুর রহমান জয়পুরহাট আদালতে মামলার হাজিরা দিয়ে আসছেন। বাদী পক্ষ আদালতে উপস্থিত না থাকলেও তারিখের দিনে তাকে হাজিরা দিতে হয়।
শামসুর রহমান বলেন, এনজিও মামলা প্রত্যাহার করে নিলেই সব মিটে যায়, কিন্তু তারা তা করছেন না। কেন করছেন না তাও তার জানা নেই। মাসের পর মাস তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। তার খামার শেষ। এনজিওতে গেলে আগের কর্মকর্তারা নেই বলে আর কেউ ঠিকমত কথাও বলে না। এমনকি তারা কেউ কিছুই জানেন না বলে অফিস থেকে বের করে দেয়। এখন এ ব্যাপারে দেখারও কেউ নেই।
ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স (প্রগতি) কালাই শাখার ব্যবস্থাপক মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাসের ব্যাপারে আমার জানা নেই। আমি সবেমাত্র এখানে যোগ দিয়েছি। এসবের কিছুই জানি না। বিষয়টি এখন আদালতের। আদালতই সমাধান করবেন ‘
শামসুর রহমান বলেন, সে সময় করোনার প্রকোপে ব্যবসায়ে ধস নামে। বিক্রির মহুর্তে জীবিত মুরগী মাটিতে পুঁতে রাখার কারণে তার সবকিছু শেষ হয়ে যায়। তারপরও মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাসে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করে ঋণের পুরো টাকা জমা দিয়েছেন।
আসামি পক্ষের আইনজীবী লক্ষণ শীল বলেন, ‘ঋণ পরিশোধের কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বাদীপক্ষ ঋণের বিপরিতে চেক ডিজঅনার মামলা করেছে। ঋণের টাকা পরিশোধ করে নিলেও তারা চেক ডিজঅনার মামলা প্রত্যাহার করেনি। ঋণের বিপরিতে চেক ডিজঅনার মামলা অন্যায়। আসামিকে হয়রানি করা ছাড়া কিছুই না।’
কালাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার শামীম আরা বলেন, ‘খামারি ঋণ শোধ করে দিয়েছেন। তাহলে মামলা প্রত্যাহার হবে না কেন? এখন আদালতে টাকা জমা দিতে হলে এনজিওর ব্যবস্থাপক দিক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে সমাধান করা হবে।’
কেকে/এমএ