বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬,
৪ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
শিরোনাম: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সই, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সংঘাত অবসানের আশা      বর্তমান সরকার কোনো দলের নয় সবার : প্রধানমন্ত্রী      হাম ও উপসর্গে একদিনে আরও ৪ জনের মৃত্যু      ভারত সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা বিবেচনাধীন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘লুটপাটের বাজেট’ বললেন আমির হামজা      সংসদে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্লান’র ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী      চালের সরবরাহ পরিস্থিতি স্থিতিশীল: বাণিজ্যমন্ত্রী      
খেত খামার
মৌলভীবাজারে আনারকলি ফল চাষে সালেহ আহমদের বাজিমাত
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ১১:১৪ এএম
আনারকলি ফল। ছবি: প্রতিবেদক

আনারকলি ফল। ছবি: প্রতিবেদক

বিদেশি ফল ‘প্যাশন ফ্রুট’ বাংলাদেশে ‘আনারকলি’ বা ‘ট্যাং ফল’ নামে পনিচিত। এ ফল চাষ করে দারুণ সফলতা পেয়েছেন মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের চাষি সালেহ আহমদ। জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে কয়েক বছর আগেই ফলটির চাষ শুরু হয়। তবে এই প্রথম সমতলে আনারকলির বাণিজ্যিক চাষ শুরু করেছেন তিনি। এ কৃষি উদোক্তা কমলগঞ্জ উপজেলার ৫ নম্বর কমলগঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বাঘমারা গ্রামের বাসিন্দা। 

জানা গেছে, মুদু টক-মিষ্টি স্বাদের আনারকলি ফলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে দিন দিন। প্রতি পিস আনারকলি পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১৫ টাকায়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়াই সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে আনারকলি ফল চাষ করা যায়। যে কারণে এর উৎপাদন খরচও কম। ফলে নেই কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি। স্বাদে-গন্ধে অনন্য এ ফলের আবাদে জেলায় ফল উৎপাদনে দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা। 

উদ্যোক্ত সালেহ আহমদ জানান, দর্ঘিদিন ধরে তিনি ধান চাষের পাশাপাশি নিজের জমিতে গড়ে তুলেছেন লেবু, লটকনসহ দেশি-বিদেশি নানা ফলের ক্ষুদ্রায়তন বাগান। ২০২২ সালে নিজের চার শতাংশ জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে তিনটি চারা রোপণের মাধ্যমে শুরু করেন আনারকলি চাষ। ২০২৪ সালে তার ওই তিনটি গাছের ফল পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করেন ১০ হাজার টাকা। আনারকলি ফল বিক্রির পর চাষে তার উৎসাহ বেড়ে যায়। ওই বছরই আরও বেশ কিছু চারা রোপণ করে বাণিজ্যিকভাবে এ ফলের চাষাবাদে তিনি সফলতা অর্জন করেন। বর্তমানে তার বাগানের গাছগুলোতে যে ফল এসেছে তাতে সালেহ আহমদ চলতি মৌসুমে লক্ষাধিক টাকার ফল বিক্রির প্রত্যাশা করছেন। 

সরেজমিনে সালেহ আহমদের আনারকলি ফলের বাগানের গিয়ে দেখা যায়, মাচাং ও বড় বড় গাছের উপর লতানো আনারকলি, প্যাশন ফ্রন্ট বা ট্যাং ফলের গাছগুলো ভরে গেছে ফুল ও ফলে। 

আলাপকালে কৃষক সালেহ আহমদ বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। বাপ-দাদাও কৃষক ছিলেন। কৃষিই আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম। ২০২২ সালে কৃষির কাছে একটি খাসিয়া পান পুঞ্জির মন্ত্রীর (পুঞ্জি প্রধান বা হেডম্যান) বাড়িতে প্রথম প্রথম দেখি আনারকলি ফল। ফলটি দেখে পরে ওই মন্ত্রীর কাছে চারা চাইলে তিনি জানান চারা জানবে মেয়ে মাটিতে রোপন করলেই গাছ হবে।

তার কথামতো তিনটি ভাল কেটে আনি এবং নিতান্তই শখের বসে আমার পরিতাক্ত একটি জমিতে তা রোপন করি। কিছুদিনের মধ্যেই এসব ডালে নতুন পাতা গজায় এবং তরতর করে গাছগুলো লাউ গাছের মতো বড় হতে থাকে। পরে মাচাং তৈরি করে দেই। মাচাংয়ে বড় হতে হতে এক বছরের মধ্যে সুন্দর ফুল ও পরে ফল হতে থাকে। ডাল রোপণের প্রথম বছরই বাড়িতে আমরা অনেকগুলো ফল খাই এবং এলাকার মানুষও ফল চেয়ে নেন। এলাকার এমন কোন বাড়ি নেই যারা আগ্রহভরে আমার কাছ থেকে ফল নেননি। তবে কোনদিনও ভাবতে পারিনি এসব ফল বিক্রি করতে পারবো। 

২০২৪ সালে আমার এলাকার সায়েদ আলী নামের এক যুবক আমাকে ফল কেনার প্রস্তাব দেয়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে তার নানা মৌসুমি ফলের দোকান রয়েছে। তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে আমি গাছে ঝুলতে থাকা পাকা ফলগুলো প্রতি পিস ২৫ টাকা দরে তার কাছে বিক্রি করতে থাকি। এলাকায় বণ্ঠন ও আমার পরিবারের চাহিদা মেটানোর পরও মৌসুম শেষে ফল বিক্রির অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার টাকারও বেশি। 

এতে আগ্রহ বাড়ে, নিজের গাছের কলম ও ফলের বীজ থেকে আরও চারা করি। বর্তমানে আমার বাগানের মাচাংয়ে এবং আশপাশের আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন গাছে রয়েছে অনেকগুলো আনারকলি ফলের গাছ। যে পরিমাণ ফুল ও ফল এসেছে তাতে ধারণা করছি এ বছর কমপক্ষে লক্ষাধিক টাকার বিক্রি করতে পারব। তবে ফুল ধরার পর মৌমাছির আক্রমণে অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। নতুবা ফলের ও বিক্রির আয়ের সংখ্যা আরও বাড়তো। এখন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ফল ও চারা কিনতে আসছেন। 

বাঘমারা গ্রামের ছদরুল হোসেন বলেন, বকৃষক সালেহ আহমদের আনারকলি ফলের বাগান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে। মাত্র চার শতক জমির বাগানে শতশত ফল ধরে। এই ফলের উৎপাদন

প্রতিটি গাছের ডগায় প্রচুর ফল ধরে। এ ফল চাষ করতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। জৈব পদ্ধতিতে আবাদ করা যায়। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। ভিটামিন-সি, আয়রন, জিংক ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এ ফল। কৃষক সালেহ আহমদ বলেন, বলেন, বিঘাপ্রতি আনারকলি চাষ করলে কয়েক লাখ টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব। এই ফল পিস হিসেবে বিক্রি করা হয়। উৎপাদন খরচ খুবই কম। বর্তমানে ফল উৎপাদনের পাশাপাশি চারা উৎপাদন শুরু অনেক বেশি। আনারকলি ফল খেতেও মজাদার।

স্থানীয় কৃষক তপন চাষা বলেন, আমরা আগে এই ফল চিনতাম না। সালেহ আহমদের বাগান দেখে অনেকেই হাসাহাসি করতো। ফল ধরার ফল কিনতে বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসছে। জানা যায়, আনারকলি মাচায় চাষ করতে হয়। প্রতিটি গাছের ডগায় প্রচুর ফল ধরে। এ ফল চাষ করতে রাসায়নিক সারের প্রয়োজন হয় না। জৈব পদ্ধতিতে আবাদ করা যায়। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই। ভিটামিন-সি, আয়রন, জিংক ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ এ ফল। 

কৃষক সালেহ আহমদ বলেন, বলেন, বিঘাপ্রতি আনারকলি চাষ করলে কয়েক লাখ টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব। এই ফল পিস হিসেবে বিক্রি করা হয়। উৎপাদন খরচ খুবই কম। বর্তমানে ফল উৎপাদনের পাশাপাশি চারা উৎপাদন শুরু করেছি। অনেকেই এসে চারা নিয়ে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে ব্যাপক চাষের আশা করছেন এ কৃষক। 

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যাশন ফ্রন্ট একটি বিদেশী ফল। বহুবর্ষজীবী লতা জাতীয় উদ্ভিদ প্যাশণ ফ্রন্ট অনেকের কাছে ট্যাং ফল নামে পরিচিত। যা স্থানীয়ভাবে আনারকলি ফল নামে পরিচিত। এটি Passifloraceae গোত্রের ফল যার ইংরেজি নাম Passion fruit এবং বৈজ্ঞানিক নাম Passiflora edulis। প্যাশন ফল দুই ধরনের। পার্পল প্যাশন ফল (Passiflora edulis) ও

হলুদ প্যাশন ফল (Passiflora edulis var flavi-carpa)। পার্পল প্যাশন ফল থেকে প্রাকৃতিক মিউটেশনের মাধ্যমে হলুদ প্যাশন ফল উৎপত্তি হয়েছে, যা আকারে ও গুণাগুণে মাতৃ পার্পল প্যাশন ফল থেকে উন্নত। এটি বিদেশি ফল হলেও আমাদের দেশে এটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে দিন দিন। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগ ছাড়াই সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে আনারকলি বা ট্যাং ফল চাষ করা যায়। যে কারণে এটির উৎপাদন খরচও কম। ফলে নেই কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি। বরং এ ফলটি ভিটামিন সি, আয়রণ, জিংক, ভিটামিন সমৃদ্ধ। বাজারে প্রচলিত কেমিক্যালমিশ্রিত শরবতের চেয়ে প্যাশন বা ট্যাং ফল দিয়ে তৈরি শরবত অনেক বেশি সুস্বাদু ও প্রাকৃতিক গুণসম্পন্ন। 

কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, কমলগঞ্জের মাটি অত্যন্ত মত্যন্ত উর্বর। এই মাটিতে নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফল উৎপাদন হচ্ছে। এ এলাকার কৃষকরাও অত্যন্ত পরিশ্রমী। অনেক কৃষক এখানে নানা জাতের ফল চাষে সফলতা পেয়েছেন। আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছি। কৃষক সালেহ আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা তাকে প্যাশন ফ্রুট বা ট্যাং ফল বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরামর্শ দেব। আর আমি নিজে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার বাগান পরিদর্শন করব।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. জালাল উদ্দিন বলেন, মৌলভীবাজার জেলায় বিদেশি প্যাশন ফ্রুটসহ নানা জাতের দেশি-বিদেশি ফল উৎপাদন হচ্ছে। জেলা কৃষি বিভাগ থেকে সব কৃষককে সার্বিক পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খেত খামার- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close