চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে মুখোমুখি হলাম এক পরম প্রাপ্তির। শুক্রবার (২৬ জুন) হলভর্তি দর্শকের ফিসফাস আর প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে যখন মঞ্চের আলো জ্বলে উঠল, তখন থেকেই যেন বুঁদ হয়ে গেলাম এক অন্য ভুবনে। উপভোগ করলাম থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রামের ৩৫তম প্রযোজনা ‘স্থানাংক’।
কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের দারুণ ও মননশীল লেখনী আর নির্দেশক তাপস শেখরের জাদুকরী মঞ্চভাবনায় নাটকটি যেভাবে আমাদের অস্তিত্বের গভীর সংকটকে ব্যবচ্ছেদ করল, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। সত্যিই অনেক দিন পর চট্টগ্রাম মঞ্চে এমন নিখুঁত ও গভীরতা সম্পন্ন মনস্তাত্ত্বিক একটি প্রযোজনা দেখার সুযোগ হলো, যার রেশ থিয়েটার হলের বাইরে এসেও কাটছে না।
বর্তমানে চট্টগ্রামে থিয়েটার ইনস্টিটিউট (টিআইসি) ও জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বিভিন্ন দলের নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছে। সব মিলিয়ে সেখানে এখন একটা দারুণ সজীব পরিবেশ বিরাজ করছে। আর থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রাম এ অঞ্চলের নাট্য আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। দীর্ঘদিন ধরে তারা নিয়মিত প্রযোজনা করে আসছে, যা শুধু বিনোদন নয়, সমাজ ও মানুষের অভ্যন্তরীণ জগতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। দলটির ৩৫তম প্রযোজনা ‘স্থানাংক’ প্রথম মঞ্চায়ন থেকেই ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের সাহায্যার্থে উৎসর্গ করা হয়েছে। এই মহৎ উদ্যোগ নাটকের মূল থিমের সাথেও গভীরভাবে সংগতিপূর্ণ—যেখানে উঠে এসেছে জীবনের অনিশ্চয়তা, অস্তিত্বের সংকট এবং মানুষের সীমাবদ্ধতা।
নাটকটি মূলত মানুষের চেনা বৃত্ত, তার একাকীত্ব এবং সম্পর্কের ভেতরের অদৃশ্য টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। মানুষ কি সত্যিই নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় চলে, নাকি কোনো অদৃশ্য সুতো তাকে নিয়ত নিয়ন্ত্রণ করে—এই জটিল দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্নটাই চরিত্রগুলোর দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের নাট্যজগতে সুপরিচিত নাট্যকার ও নির্দেশক কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের লেখনী এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার সরল কাহিনির পেছনে যে দার্শনিক গভীরতা থাকে, তা দর্শককে সরাসরি ভাবায়। ‘স্থানাংক’-এও নীল, অণু ও জ্যোতি—এই তিন চরিত্র নিজেদের পরিচয়, ভূমিকা ও বাস্তবতা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভোগে। তারা প্রশ্ন করে, “আমি কে? সমাজে আমার অবস্থান কোথায়? আমি কি নিজের সিদ্ধান্তে চলছি নাকি অন্য কারো নিয়ন্ত্রণে?” এই প্রশ্নগুলো আসলে আমাদের সকলের।
প্রথাগত সহজ-সরল কাহিনির বাইরে গিয়ে এমন একটি জটিল বিষয়কে মঞ্চে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রামের দলপ্রধান ও বিশিষ্ট নাট্যনির্দেশক তাপস শেখরের অসাধারণ নির্দেশনা পুরো নাটকটিকে এক সুতোয় বেঁধেছে। তার পূর্বের প্রযোজনাগুলোর মতোই এখানেও গভীরতা ও কারিগরি মুন্সিয়ানা দেখা গেছে। তিনি চরিত্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে মঞ্চের গতিশীলতা, স্পেস ব্যবহার ও নিখুঁত টাইমিংয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
নাটকের ছন্দ, পজ ও সাইলেন্স এতটাই সুনিয়ন্ত্রিত ছিল যে, দর্শক চরিত্রগুলোর মানসিক যন্ত্রণা নিজের ভেতরে অনুভব করতে পারে। নির্দেশনার পাশাপাশি নাটকের আবহসংগীত পরিকল্পনাতেও তার গভীর মননশীলতার ছাপ রয়েছে। এই পুরো দর্শনটিকে মঞ্চে জীবন্ত করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এর নেপথ্য কারিগরদের। দীপক পালের পরিমিত অথচ দারুণ সেট নির্মাণ শুরুতেই নাটকের গাম্ভীর্য ও একটি রূপক পরিবেশ তৈরি করে দেয়। মঞ্চের এই মিনিমালিস্ট ডিজাইন এবং সিম্বলিক এলিমেন্টগুলো চরিত্রের একাকীত্ব ও মানসিক জগতকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
আর সেই সেটের ওপর ঠান্ডু রায়হানের আলোক পরিকল্পনা ছিল এক কথায় জাদুকরী ও মাস্টারপিস! থিয়েটারে আলোর ব্যবহার যে কতটা শক্তিশালী ভাষা হয়ে উঠতে পারে, তা এই শো না দেখলে বোঝা যেত না। আলোর প্রতিটি প্রক্ষেপণ, জোন বিভাজন আর ছায়ার আলো-আঁধারি খেলা চরিত্রগুলোর অবচেতন মনকে নিখুঁতভাবে দর্শকদের সামনে মেলে ধরেছিল। বিশেষ করে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের দৃশ্যগুলোতে আলোর সূক্ষ্ম মডুলেশন নাটকের গভীরতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ধরনের কারিগরি দক্ষতা চট্টগ্রামের মঞ্চে সত্যিই বিরল।
এবার আসি অভিনয়ের প্রসঙ্গে, যা এই নাটকের অন্যতম প্রধান শক্তির জায়গা। নাটকের তিনটি চরিত্রই যেভাবে পুরো মঞ্চকে শাসন করেছে, তা সত্যি প্রশংসনীয়। এই নাটকের তিনজন অভিনয়শিল্পীই আমার খুব প্রিয় এবং কাছের মানুষ।
নাটকের ‘নীল’ চরিত্রে সাইফুল ভাই (মো. সাইফুল ইসলাম) বরাবরের মতোই জাতশিল্পীর পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর অভিনয়, কণ্ঠের মডুলেশন, ডায়ালগ ডেলিভারি ও এক্সপ্রেশন এতটাই নিখুঁত ছিল যে, প্রতি মুহূর্তেই চরিত্রের ভেতরের ছটফটানি ও মানসিক যন্ত্রণা দর্শককে স্পর্শ করছিল। মঞ্চে তাঁর বলিষ্ঠ উপস্থিতি পুরো হলের মনোযোগ ধরে রাখে। সাইফুল ভাইয়ের অভিনয়ে একধরনের সততা ও গভীরতা আছে যা দর্শককে চরিত্রের সাথে একাত্ম করে দেয়। এছাড়া সাইফুল ভাই ও তাপসদার যৌথ সংগীত পরিকল্পনা নাটকের পরিমণ্ডলকে আরও জমাট করেছে।
‘অণু’ চরিত্রে অনিন্দিতা শেখর চৈতী ছিলেন এই নাটকের এক বড় চমক। প্রথমবার এত বড়, জটিল ও মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাসে অভিনয় করা সত্ত্বেও তিনি যেভাবে নিজেকে সামলেছেন এবং চরিত্রটি ধারণ করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তাঁর শারীরিক ভাষা, চোখের অভিব্যক্তি এবং আবেগের স্তরগুলো নাটককে আরও সমৃদ্ধ করেছে। চৈতী, তুমি অণু চরিত্রটি যথাযথভাবেই ফুটিয়ে তুলেছো।
সামনে যখন এই নাটকের পঞ্চম শো হবে, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তুমি নিজেকে আরও ছাড়িয়ে যাবে এবং অণু চরিত্রের গভীরতা উপলব্ধি করবে আরও গভীরভাবে। তোমার এই পথচলা আরও সুন্দর হোক।
আর জ্যোতি চরিত্রের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। এই নাট্য আয়োজনে জ্যোতি চ্যাটার্জির চমৎকার অভিনয় দক্ষতা দেখা গেছে। বিশেষ করে তার অভিনীত তিনটি নাটকের চরিত্রের বৈচিত্র্য ছিল চোখে পড়ার মতো। যেমন, ‘অন্তর্দাহ’ নাটকে তিনি রূপদান করেছেন চঞ্চল চরিত্রটি, ‘বেদুয়া’-তে তার দেখা মিলেছে যীশু চরিত্রে। নাজিম উদ্দীন মামুন তার পূর্বের এই চেনা, চঞ্চল ও জনপ্রিয় সব চরিত্রকে ছাপিয়ে মঞ্চে হয়ে উঠেছেন সত্যিকারের জ্যোতি। তিনি ছাড়া এই চরিত্রটিকে এতটা প্রাণবন্ত, গতিশীল আর জীবন্ত করা বোধহয় আর কারও পক্ষে সম্ভব হতো না। মামুনের অভিনয়ের মধ্যে এমন এক ধরনের সততা ও শক্তি ছিল, যা পুরো মিলনায়তনকে স্তব্ধ করে রেখেছিল। নাটকের কিছু কিছু তীব্র আবেগীয় অংশে তার সংলাপ প্রক্ষেপণ আর শারীরিক অভিনয়ে আক্ষরিক অর্থেই আমার শরীরে কাঁটা দিচ্ছিল। তোমাকে নিয়ে সত্যিই প্রাউড ফিল করি মামুন ভাই। এই চরিত্রটি তোমার ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা কাজ হয়ে থাকবে।
থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রামের এই ৩৫তম প্রযোজনাটি কেবল একটি নাটক নয়, এটি একটি অদ্ভুত, সম্মোহনী ও চিন্তাশীল সাইকোলজিক্যাল জার্নি। অভিনয়ের তীব্রতা, চমৎকার সেট নির্মাণ, আলোকসজ্জা ও সংগীতের নিখুঁত যুগলবন্দিতে এই প্রযোজনাটি দেখার পর থিয়েটার নিয়ে ভালো লাগা এবং গর্বটা আরও অনেক বেড়ে গেল। একটি নাটক দেখার পর যখন দর্শক হল থেকে বের হয়েও চরিত্রগুলো আর তাদের সংলাপ নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়, সেখানেই নাটকের সার্থকতা। ‘স্থানাংক’ ঠিক সেই কাজটিই করতে পেরেছে।
তবে একটি ভালো প্রযোজনাকে আরও নিখুঁত ও পরিপক্ব করে তুলতে এর খামতিগুলো নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। ‘স্থানাংক’ নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার প্রয়াস, কিন্তু এর কিছু জায়গায় আরও যত্ন নেওয়ার সুযোগ ছিল। নাটকের সংলাপগুলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাত্রায় তাত্ত্বিক ও দর্শনে ভারাক্রান্ত মনে হয়েছে, যা সাধারণ দর্শকের জন্য ধারণ করা কিছুটা কঠিন এবং তা নাটকের স্বাভাবিক গতিকে কিছুটা শ্লথ (স্লো) করে ফেলেছিল।
এছাড়া মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের তীব্রতা ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে কিছু দৃশ্যে অভিনয়ের পরিমিতিবোধ আরও একটু সূক্ষ্ম হতে পারত, যেখানে লাউডনেসের চেয়ে নীরবতা বা অবদমিত আবেগ বেশি কার্যকর হতো।
দ্বিতীয়ার্ধের তুলনায় প্রথমার্ধের গতি যেন কিছুটা খেই হারিয়েছিল। মানে দ্বিতীয়ার্ধের দিকে জ্যোতি ঢোকার পর প্রাণ ফিরে পায়।কারিগরি দিক থেকে আলোর ব্যবহার জাদুকরী হলেও, কিছু কিছু জায়গায় আলোর অতি-ব্যবহার বা অতি-মডুলেশন দর্শকের মনোযোগ মূল অভিনয় থেকে কিছুটা বিচ্যুত করছিল।
সবকিছু মিলিয়ে ‘স্থানাংক’ কেবল একটি নাটক নয়, এটি একটি চিন্তাশীল সাইকোলজিক্যাল জার্নি। এই ছোটখাটো ভুলত্রুটি বা খামতিগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে আগামী শোগুলোতে এই প্রযোজনাটি আরও অনেক বেশি অটুট ও সাবলীল হয়ে উঠবে। এই অসাধারণ ও কঠোর পরিশ্রমী কাজের সাথে জড়িত সামনের এবং পেছনের প্রতিটি মানুষের জন্য রইল বুকভরা ভালোবাসা। থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রামকে আন্তরিক ধন্যবাদ এমন একটি মনে রাখার মতো সন্ধ্যা উপহার দেওয়ার জন্য। জয় হোক থিয়েটারের, ভালোবাসা অবিরাম!
কেকে/এমএ