অবৈধ দখল ও ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে কক্সবাজারের চকরিয়ার বনভূমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত বনাঞ্চলের জমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে। বন কেটে বসতি, কৃষিজমি, ফলের বাগান ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে নীরবে বদলে যাচ্ছে বনাঞ্চলের পরিবেশ।
এছাড়া দীর্ঘদিনের দখলদারির কারণে সংকুচিত হচ্ছে বনের পরিধি। এর ফলে জীববৈচিত্র্য, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি ও ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জ এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের চুনতি রেঞ্জ ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের মোট বনভূমির প্রায় ৪০ শতাংশ ইতোমধ্যে দখল, অবৈধ ব্যবহার কিংবা ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে বন হিসেবে কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর ফলে সংকুচিত হচ্ছে হাতিসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর আবাস, বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাত এবং পরিবেশগত ঝুঁকি।
সরেজমিন উপজেলার হারবাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, বরইতলী, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী ও আশপাশের বনাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক বছর আগেও যেসব এলাকায় ঘন বন ছিল, সেখানে এখন সারি সারি বসতঘর, কৃষিজমি, ফলের বাগান ও বিভিন্ন স্থাপনা। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, বন হারানোর এ প্রক্রিয়া ধীরগতির হলেও বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জে বনভূমির পরিমাণ ১৩ হাজার ৬০১ একর, ফুলছড়ি রেঞ্জে ৯ হাজার ৯৩৮ একর এবং চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের আয়তন প্রায় ১৯ হাজার ১৮২ একর। সব মিলিয়ে বনভূমির পরিমাণ প্রায় ৪২ হাজার ৭২১ একর।
তবে বন বিভাগ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, এর অন্তত ৪০ শতাংশ বনভূমি ইতোমধ্যে দখল, অবৈধ ব্যবহার কিংবা ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের কারণে কার্যত বন হিসাবে অস্তিত্ব হারিয়েছে। সেই হিসাবে প্রায় ১৭ হাজার একরের বেশি বনভূমি এখন ঝুঁকির মুখে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, সংঘবদ্ধ কয়েকটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে ফুলছড়ি, ফাঁসিয়াখালী ও চুনতি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে বনভূমি দখল করছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব চক্রের দালালরা আগ্রহী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বনভূমির জায়গা দেখিয়ে দেয়। এরপর ধাপে ধাপে সেখানে ঘর নির্মাণ করে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তীতে দখলকৃত জমি প্লট আকারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বনবিভাগে বসবাসরত স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট রেঞ্জ ও বনবিট কর্মকর্তাদের নীরব প্রশ্রয় বা দায়িত্বে অবহেলা ছাড়া এ ধরনের দখল দীর্ঘদিন ধরে চলা সম্ভব নয়। তাদের দাবি, বনভূমিতে খুঁটি পুঁতে ঘর নির্মাণের আগেই সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করতে হয়। অন্যথায় সেখানে স্থাপনা নির্মাণ বা দখল ধরে রাখা কঠিন।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের এক সাবেক কর্মকর্তা বলেন, জনবল সংকট, মামলা-জটিলতা কিংবা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কথা প্রায়ই বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে এসব যুক্তি দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অনিয়মের অভিযোগ আড়াল করার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আন্তরিকতা থাকলে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় অধিকাংশ দখলদারের বিরুদ্ধে কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা সম্ভব।
পরিবেশকর্মীদের দাবি, বনভূমি দখলের ফলে হাতির চলাচলের করিডর সংকুচিত হচ্ছে, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক সংযোগ। বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাত, মাটি ক্ষয়, ভূমিধসের ঝুঁকি, কমছে জলাধারণ ক্ষমতা এবং ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চকরিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলা উদ্দিন আলো বলেন, বনভূমি দখল এখন পরিবেশগত দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। কার্যকর নজরদারি ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। ইতোমধ্যে বনবিভাগের অন্তত ৪০ শতাংশ বনভূমি দখল হয়ে গেলেও বনবিভাগ কর্তৃক তেমন কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।
চকরিয়া পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি এম. আর. মাহমুদ বলেন, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো দখলের ঘটনা নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ প্রক্রিয়া। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্যের স্বচ্ছতা ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া এ প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব নয়।
অভিযোগের বিষয়ে ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা কুদ্দুসুর রহমান বলেন, বনভূমি রক্ষায় নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান, টহল ও নজরদারি চালানো হচ্ছে। দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা আবির হাসান বলেন, সীমিত জনবল ও বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের কারণে সব এলাকায় একযোগে নজরদারি করা সম্ভব হয় না। তারপরও বন রক্ষায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মারুফ হোসেন বলেন, বনভূমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় বনভূমি পুনরুদ্ধারের কার্যক্রমও চলছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ সোহেল রানা বলেন, বনভূমি দখল শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এর সঙ্গে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও জড়িত। তাই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
কেকে/ এমএস