কুমিল্লার দাউদকান্দি ইলিয়টগঞ্জ মহাসড়কের সেতুর নিচে যতদূর চোখ যায়, শুধু বর্জ্যের স্তূপ। প্লাস্টিক, পলিথিন, পচা-আবর্জনা আর কচুরিপানায় ঢেকে গেছে নদীর বুক। দুর্গন্ধে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকাই কষ্টকর। একসময় যেখানে নৌকা চলত, জেলেদের জালে ধরা পড়ত দেশীয় মাছ, আজ সেখানে জমেছে ময়লার পাহাড়। গোমতী নদীর শাখা কালাডুমুর নদ এখন যেন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
দাউদকান্দি উপজেলার ঐতিহাসিক ইলিয়টগঞ্জ বাজারের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে বছরের পর বছর ধরে বাজারের ময়লা-আবর্জনা নদীর তীরে এবং সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, কমছে নাব্যতা, বাড়ছে দূষণ ও হুমকির মুখে পড়ছে কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা।
দাউদকান্দি, চান্দিনা, মুরাদনগর, দেবীদ্বার ও চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার মানুষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র ইলিয়টগঞ্জ বাজার। অথচ এই বাজারের কোনো কার্যকর ও স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিদিনের আবর্জনার বড় একটি অংশ গিয়ে পড়ছে কালাডুমুর নদে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় নদীর পানি ছিল স্বচ্ছ। নিয়মিত নৌকা চলাচল করত, দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন নদীর বড় অংশ কচুরিপানা ও বর্জ্যে ঢেকে গেছে। পানি কালচে হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। মাছসহ জলজ প্রাণীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
গোমতী নদীর গৌরীপুর উৎস থেকে ইলিয়টগঞ্জ বাজার পর্যন্ত কালাডুমুর নদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩ কিলোমিটার। ইলিয়টগঞ্জ থেকে পতনমুখ পর্যন্ত আরও প্রায় ১০ কিলোমিটার। প্রায় ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীর পানি ব্যবহার করে আনুমানিক ৫০ হাজার বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, এ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদনে কালাডুমুর নদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় এক জেলে বলেন, ‘আগে নদীতে মাছ ধরেই সংসার চলত। এখন মাছ নেই বললেই চলে। নদীতে নৌকাও চলতে পারে না। নদীর এই অবস্থা আমাদের জীবন-জীবিকাকেও বিপদের মুখে ফেলেছে।’
একাধিক কৃষক বলেন, ‘এই নদীর পানি দিয়েই আমাদের চাষাবাদ হয়। নদী ভরাট ও দূষিত হওয়ায় কৃষির ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে বড় সংকট তৈরি হবে।’
নদীপাড়ের এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে এই নদী দেখছি। একসময় এটি ছিল আমাদের গর্ব। এখন চোখের সামনে নদীটাকে মরে যেতে দেখছি।’
এগ্রিকালচারাল ইম্পর্ট্যান্ট পারসন (এআইপি) মতিন সৈকত বলেন, ‘ইলিয়টগঞ্জ বাজারের বর্জ্যে কালাডুমুর নদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। নদীটির পুনঃখনন, বর্জ্য অপসারণ ও দখল-দূষণ বন্ধে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, বাজার কমিটি ও স্থানীয় জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’
ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশনের জায়গা না থাকায় সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় একাধিকবার উত্থাপন করা হয়েছে।’
দাউদকান্দি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌরসভার প্রশাসক রেদওয়ান ইসলাম বলেন, ‘ডাম্পিং স্টেশনের জায়গা সংকট রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড পর্যায়ক্রমে নদী ও খাল খননের মাধ্যমে দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।’
কেকে/এমএ