গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সংকট, জনবল স্বল্পতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ধুঁকছে। শতবর্ষী জরাজীর্ণ টিনশেড ভবনে সীমিত জনবল নিয়ে চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় কাপাসিয়াসহ পার্শ্ববর্তী দুই জেলার প্রায় এক লাখ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চনার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, টোক ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি একটি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ টিনশেড ভবনে পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের অভ্যন্তরে অস্থায়ী পার্টিশন দিয়ে চিকিৎসা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। টিনের চাল ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশ মরিচা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টির সময় ছাদ দিয়ে পানি চুইয়ে পড়ায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পর্যাপ্ত আলো ও আসবাবপত্রের অভাব থাকায় রোগী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। এছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাতায়াতের সড়কটিও সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, টোক ইউনিয়নের পাশাপাশি ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকসহ প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অনুমোদিত পাঁচটি পদের মধ্যে মেডিকেল অফিসার, মিডওয়াইফ, উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্ট ও অফিস সহায়কের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুজন কর্মকর্তা। ফলে প্রতিদিন গড়ে ১০০-১১০ রোগীকে সীমিত জনবল দিয়েই সেবা দিতে হচ্ছে।
টোক ইউনিয়নের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণ রোগের চিকিৎসার জন্য আমরা এই কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করি। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায় না।’
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, ‘দূর থেকে চিকিৎসা নিতে এসে ভবনের বেহাল অবস্থা দেখে হতাশ হতে হয়। বৃষ্টি হলে রোগী নিয়ে অবস্থান করাও কষ্টকর হয়ে পড়ে।’
কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, ‘এ অঞ্চলের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা জরুরি।’
স্থানীয় নাসরিন সুলতানা, শিউলী আক্তার ও মমতাজ বেগম জানান, গর্ভবতী নারী, শিশু ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা নিতে এসে নানা ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। চিকিৎসক সংকট, ওষুধের স্বল্পতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে অনেক রোগীকেই অন্যত্র চিকিৎসা নিতে যেতে হয়।
পল্লী চিকিৎসক তাপস দাস জানান, স্বাধীনতার পূর্বে প্রতিষ্ঠিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন হয়নি।
তিনি বলেন, ‘বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবন নির্মাণ এবং জনবল নিয়োগ প্রয়োজন।’
স্থানীয় বাসিন্দা শরিফ কামাল হোসেন বলেন, অতীতেও একাধিকবার ভবন নির্মাণের উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও জমি-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিই উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রধান চিকিৎসা ভরসা।’
উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কর্মকর্তা ও উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার মো. আজহার উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন শতাধিক রোগী এখানে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। কিন্তু জনবল ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে ওষুধ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সমস্যার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং নতুন ভবন নির্মাণ ও জনবল নিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।’
কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না তাসনীম বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সমস্যাগুলো সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সমস্যার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনবল সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর গাজীপুর বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘টোক ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
কেকে/এমএ