খুলনার ঘটনাপ্রবাহ একটি ভয়াবহ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে- আইনের হাত যাদের স্পর্শ করে, তারা কিছুদিনের মধ্যেই সেই হাত থেকে ছুটে গিয়ে আবার একই পথে ফিরে যায়। গত দেড় বছরে পুলিশের তালিকাভুক্ত ১৫ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে, যাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মতো গুরুতর অপরাধে একাধিক মামলা রয়েছে। অথচ তাদের সবাই ইতোমধ্যে জামিনে মুক্ত। কেউ কেউ মুক্তির কয়েক দিনের মাথায় নতুন অপরাধে জড়িয়েছে।
এই চিত্র প্রশ্ন তোলে- আমাদের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা কি আদৌ প্রতিরোধমূলক ভূমিকা রাখতে পারছে, নাকি তা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে? এ ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো পুনরাবৃত্তির ধরন। শীর্ষ সন্ত্রাসী আরমান হোসেন মোল্লা হত্যা ও আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত সাতটি মামলার আসামি হয়েও উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে আত্মগোপনে থেকে নতুন অপরাধে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ।
শামীম সরদার ওরফে ঢাকাইয়া শামীম মুক্তির মাত্র ১১ দিনের মাথায় গুলির ঘটনায় অংশ নিয়েছেন। এ ধরনের একাধিক দৃষ্টান্ত থেকে স্পষ্ট, বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সমস্যা এখানে কাজ করছে। এ সমস্যার মূলে রয়েছে কয়েকটি পরস্পরসংশ্লিষ্ট কারণ। তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতার কারণে অনেক মামলা আদালতে টেকসই যুক্তি হিসেবে দাঁড়াতে পারে না, ফলে জামিন ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা- অনেক পরিবার হুমকির কারণে সাক্ষ্য দিতে বা মামলা করতেই ভয় পাচ্ছে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দিচ্ছে। জামিন বিবেচনার সময় শুধু এজাহারের বিবরণ নয়, অভিযুক্তের অপরাধপ্রবণতার ধারাবাহিক ইতিহাস ও সমাজে তার প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার ঘাটতি রয়েছে।
এছাড়াও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গতিবিধি নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব পুলিশের হাত-পা বেঁধে রাখছে। এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীদের পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা ও অসহায়ত্ব সবচেয়ে বেশি আলোচনার দাবি রাখে। একজন নিহতের স্বজনের ভাষ্য থেকে স্পষ্ট, বিচারের আশা ছেড়ে দিয়ে অনেক পরিবার নীরবে হুমকি সহ্য করছে। এটি কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থা ক্ষয়ের একটি বিপজ্জনক লক্ষণ।
যখন অপরাধী প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায় আর ভুক্তভোগী পরিবার আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়, তখন বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস তলানিতে গিয়ে ঠেকে। আমরা মনে করি, এই দুষ্টচক্র ভাঙতে অবিলম্বে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন- তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করে দ্রুত ও মজবুত অভিযোগপত্র প্রস্তুত করতে হবে, যাতে জামিনের আবেদন খারিজ করার মতো পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ আদালতের সামনে থাকে।
সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে হুমকির ভয়ে কেউ সাক্ষ্য দিতে পিছপা না হয়। জামিন শুনানির সময় অভিযুক্তের অতীত অপরাধের প্রবণতা ও সমাজে তার প্রভাব সংক্রান্ত তথ্য পুলিশের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে ও পূর্ণাঙ্গভাবে আদালতে উপস্থাপনের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। জামিনে মুক্ত তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গতিবিধি নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে এবং মুক্তির পরপরই তাদের কার্যক্রমে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।
পুলিশ, প্রসিকিউশন ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে, যাতে একই ব্যক্তি বারবার জামিনে মুক্ত হয়ে অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা আদালতের নজরে আসে এবং সামগ্রিক বিবেচনায় আসে। আইনের চোখে সবার জামিন পাওয়ার অধিকার আছে- এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যখন একই ব্যক্তি বারবার জামিনে মুক্ত হয়ে হত্যা ও সন্ত্রাসের পুনরাবৃত্তি ঘটায়, তখন প্রশ্ন ওঠে ব্যক্তির অধিকার আর বৃহত্তর জনস্বার্থের ভারসাম্য নিয়ে।
খুলনার ঘটনাগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিচ্ছিন্নভাবে গ্রেপ্তার-জামিনের এই আবর্তন থেকে বের হতে না পারলে সন্ত্রাস দমনের যে কোনো উদ্যোগই কার্যত ব্যর্থ হতে বাধ্য। রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একযোগে এ বাস্তবতা মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে।
কেকে/ এমএস