বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়। এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনায়ক, নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, গবেষক ও সমাজসংস্কারকদের প্রস্তুত হওয়ার সুষম ক্ষেত্র। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন,ও বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ছিল অগ্রণী ও ফলপ্রসূ ।
এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, ক্যাম্পাস রাজনীতি কখনোই অপ্রয়োজনীয় নয়; বরং সুশৃঙ্খল, মূল্যবোধভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি একটি জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো বর্তমান সময়ে আমাদের ক্যাম্পাস রাজনীতি কি নেতৃত্ব তৈরির কারখানা হিসেবে কাজ করছে, নাকি ক্রমেই সহিংসতা, দখলদারত্ব ও বিভাজনের প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে? সম্প্রতি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩ আগস্ট ২০২৬ ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের পর উত্তেজনা দ্রুত অন্যান্য ক্যাম্পাসেও ছড়িয়ে পড়ে।
৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই সংগঠনের পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যার রেশ পাশের ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এলাকাতেও পৌঁছায়। একই দিনে ঢাকা কলেজে পোস্টার লাগানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের খবরও আসে। ধারাবাহিক এসব ঘটনা প্রমাণ করে, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক উত্তেজনা খুব অল্প সময়েই অন্য ক্যাম্পাসে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, যা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে ছাত্ররাজনীতি জাতীয় নেতৃত্ব তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। অতীতের পাতা উল্টালে দেখা যায় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বহু রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক নেতা তাদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকেই। অর্থাৎ ছাত্ররাজনীতি একটি ‘লিডারশিপ স্কুল’ হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছে। বিতর্কচর্চা, সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সংকট মোকাবিলার মতো গুণাবলি অর্জনের প্রাণকেন্দ্র ছিল শিক্ষাঙ্গন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আদর্শভিত্তিক রাজনীতির জায়গা দখল করেছে প্রভাব বিস্তার, হল দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, ক্ষমতার প্রতিযোগিতা এবং প্রতিপক্ষ দমনের সংস্কৃতি। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখন রাজনীতিকে গণসেবার পরিবর্তে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। ফলে ক্যাম্পাসে মতের ভিন্নতা অনেক সময় সহিংস সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হতে আগ্রহী নয়; তারা নিরাপদ, সেশনজটমুক্ত এবং গবেষণাবান্ধব শিক্ষার পরিবেশ চায়। একই ধরনের পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বিভিন্ন গবেষণা ও আলোচনায়। সেখানে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং সহিংসতামুক্ত শিক্ষাজীবনের ওপর জোর দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ইউনেস্কো তরুণদের নাগরিক অংশগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ থাকলে নেতৃত্ব বিকশিত হয়, সহিংসতা নয়।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবকে সহিংসতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যুবসম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। অথচ ক্যাম্পাসে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, শিক্ষাবিরতি ও অস্থিতিশীলতা তাদের সেই লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
একটি সহিংস ঘটনার প্রভাব শুধু কয়েকজন শিক্ষার্থীর ওপর নয়; পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সুনাম এবং অভিভাবকদের আস্থার ওপরও পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতার পেছনে কয়েকটি কারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, দলীয় রাজনীতির অতিরিক্ত প্রভাব। দ্বিতীয়ত, ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি। তৃতীয়ত, প্রশাসনের নিরপেক্ষতার সংকট। চতুর্থত, অপরাধের যথাযথ বিচার না হওয়া। যখন কোনো সহিংস ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয় না, তখন অপরাধের পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়ে।
তবে সমাধান ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা নয়। বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেমন যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। কিন্তু সেখানে সহিংসতার পরিবর্তে বিতর্ক, নির্বাচন, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং যুক্তিনির্ভর মতবিনিময়কে উৎসাহ দেওয়া হয়। অর্থাৎ সমস্যা রাজনীতিতে নয় সমস্যা রাজনীতির নামে সহিংস ও সংস্কৃতিতে। বাংলাদেশেও প্রয়োজন শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতি।
নিয়মিত ছাত্রসংসদ নির্বাচন, স্বচ্ছ সাংগঠনিক কার্যক্রম, ক্যাম্পাসে অস্ত্র ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও শিক্ষাঙ্গনকে সংঘাতের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার না করে নেতৃত্ব বিকাশের ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে নৈতিক নেতৃত্ব, সহনশীলতা ও যুক্তিবাদী সংস্কৃতির চর্চা নিশ্চিত করেন, তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
একই সঙ্গে অভিভাবক, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার দাবিকে জোরালো করা। আজকের বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ঘণ্টা গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য মূল্যবান। যদি সেসময় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অস্থিরতায় নষ্ট হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি।
অতএব, ক্যাম্পাস রাজনীতি থাকবে কারণ গণতন্ত্রে মতপ্রকাশ ও সংগঠনের অধিকার মৌলিক। তবে সেই রাজনীতি হতে হবে আদর্শ, যুক্তি, সহনশীলতা ও জনকল্যাণের রাজনীতি সহিংসতা, দখলদারত্ব ও প্রতিহিংসার নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হবে নেতৃত্ব তৈরির কারখানা, সহিংসতার প্রজননক্ষেত্র নয় এ প্রত্যাশাই আজ দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিক্ষাঙ্গনের চরিত্রে, আর শিক্ষাঙ্গনের চরিত্র নির্ধারণ করে সে জাতির আগামী দিনের নেতৃত্ব।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস