একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ প্রজন্ম। তাদের মেধা, কর্মশক্তি ও স্বপ্নের ওপরই নির্ভর করে একটি জাতির আগামী। অথচ সেই সম্ভাবনাময় প্রজন্মের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ আজ মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের মুখোমুখি। ফলে মাদক আর শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, সামাজিক স্থিতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। তাই মাদকের প্রশ্ন আজ কেবল একজন আসক্তের নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবসম্পদ, সামাজিক স্থিতি ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির প্রশ্ন।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাদকপাচার নেটওয়ার্কের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থান করায় দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের নজরে। মিয়ানমার থেকে উৎপাদিত ইয়াবা ও অন্যান্য সিনথেটিক মাদক স্থল, নৌ ও সমুদ্রপথে বিভিন্ন রুট ব্যবহার করে দেশে প্রবেশ করছে। সীমান্তে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ হলেও বাস্তবতা বলছে, সরবরাহ শৃঙ্খল এখনো অক্ষত।
ডেইলী স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশের অন্তত ১৮টি জেলার ১০৫টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে ইয়াবা, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের চোরাচালান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ‘অ্যানুয়াল ড্রাগ রিপোর্ট বাংলাদেশ ২০২৫’ অনুযায়ী, প্রধানত তিনটি করিডোর দিয়ে ফেনসিডিল, ক্রিস্টাল মেথ ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক দেশে প্রবেশ করছে। সেগুলো হলো, ভারত সীমান্তের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চল এবং মিয়ানমার সীমান্তের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল। ডিএনসি’র তথ্য অনুযায়ী দেশে ইয়াবা উৎপাদিত হয় না; অধিকাংশই সীমান্তপথে আসে। অর্থাৎ বাংলাদেশের লড়াই মূলত নিজস্ব উৎপাদনের বিরুদ্ধে নয়, একটি আন্তঃসীমান্ত সরবরাহব্যবস্থার বিরুদ্ধে। শুধু চালান আটকই শেষ কথা নয়; পুরো অর্থায়ন ব্যবস্থা, পাচারপথ এবং সংগঠিত অপরাধচক্রকে ভেঙে না ফেললে মাদকের প্রবাহ থামানো কঠিন।
বিশ্বে অস্ত্র চোরাচালানের পর সবচেয়ে লাভজনক অবৈধ ব্যবসাগুলোর একটি হলো মাদক। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এটি আর শুধু নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা নয়; এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ, সীমান্ত অর্থনীতি, অর্থপাচার এবং আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, মাদকপাচারের ধরনও বদলেছে। সংঘাতপ্রবণ সীমান্ত অঞ্চলে কোথাও কোথাও অবৈধ মাদক কার্যত বিনিময় অর্থনীতির অংশে পরিণত হচ্ছে। ফলে মাদককে শুধু পুলিশি অভিযানের বিষয় হিসেবে দেখলে সংকটের প্রকৃত গভীরতা বোঝা যাবে না।
সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমারের সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল থেকে উৎপাদিত ইয়াবা এখন শুধু অর্থ উপার্জনের পণ্য নয়; কোথাও কোথাও তা কার্যত বিনিময় অর্থনীতির অংশে পরিণত হয়েছে। সিমেন্ট, জ্বালানি, ভোগ্যপণ্যের বিনিময়ে মাদক পাচারের অভিযোগ আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে। অর্থাৎ এই ব্যবসা শুধু অপরাধ নয়; সীমান্ত অর্থনীতি ও সংঘাতের সঙ্গেও যুক্ত।
এ পরিস্থিতিতে গত ১৬ জুলাই ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ কার্যকর হয়েছে। নিঃসন্দেহে মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে দৃঢ় অবস্থান নিতেই হবে। কিন্তু কঠোর আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার প্রয়োগ হয় নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর এবং বৈষম্যহীন। নতুন (সংশোধিত) আইনে অনলাইনভিত্তিক মাদক লেনদেন ও প্রচারণাকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ডিজিটাল তথ্যকে একমাত্র প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ ডিজিটাল আলামতের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ফরেনসিক যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত অপরিহার্য; অন্যথায় বিচার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। প্রযুক্তি যেমন অপরাধ শনাক্তে সহায়ক, তেমনি পরিচয় চুরি, ভুয়া তথ্য, জাল ডিজিটাল উপাদান কিংবা হ্যাকিংয়ের ঝুঁকিও বাস্তব। একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যম-সংক্রান্ত অভিযোগে তদন্তের ক্ষেত্রে আলামত মূল্যায়নের প্রশ্নও নতুনভাবে সামনে এসেছে। তাই ডিজিটাল তথ্যকে অবশ্যই প্রকৃত উদ্ধার, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং স্বাধীন সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা জরুরি।
শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাও একই প্রশ্ন সামনে আনে। ইরানে মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় নিয়মিত। ফিলিপাইনে বিচারবহির্ভূত হত্যার নীতিও অনুসরণ করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো দেশই শুধু কঠোর শাস্তি দিয়ে মাদক সরবরাহ পুরোপুরি থামাতে পারেনি। কারণ উৎপাদন, অর্থায়ন ও পাচারের নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রসীমা অতিক্রম করে পরিচালিত হয়।
বহু দেশে মাদক অপরাধে অত্যন্ত কঠোর শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। কারণ বর্তমান মাদক বাণিজ্য কোনো একক দেশের অপরাধ নয়; এটি সীমান্ত অতিক্রমকারী অর্থনৈতিক ও অপরাধী নেটওয়ার্কের অংশ। উৎপাদন এক দেশে, অর্থায়ন অন্য দেশে, পরিবহন তৃতীয় দেশে এবং বাজার অন্যত্র- এই জটিল শৃঙ্খল ভাঙতে হলে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অর্থপাচার প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মূল অর্থদাতা ও সংগঠকদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু বাহকদের গ্রেপ্তার করে এ ব্যবসার মেরুদণ্ড ভাঙা সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে- আমাদের আইন প্রয়োগের মূল লক্ষ্য কি? বাস্তবে প্রায়ই দেখা যায়, ধরা পড়ে বাহক, অধরা থাকে অর্থদাতা। আইনের কঠোরতা তাই প্রায়ই অপরাধচক্রের শীর্ষে নয়, সবচেয়ে দুর্বল স্তরে গিয়ে থামে। সীমান্তের দরিদ্র বাহক, দিনমজুর, নৌকার মাঝি কিংবা অল্প টাকার বিনিময়ে ব্যবহৃত তরুণরাই সহজে গ্রেপ্তার হয়। অথচ যাদের অর্থ, প্রভাব ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপর দাঁড়িয়ে এই বিশাল ব্যবসা পরিচালিত হয়, তাদের অনেকেই আইনের নাগালের বাইরে থেকে যায়। ফলে অপরাধচক্রের শিকড় অক্ষত থাকে, আর আইনের কঠোরতার ভার সবচেয়ে বেশি বহন করে সমাজের প্রান্তিক মানুষ। এই বাস্তবতা আমাদের আইন ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে।
কয়েক বছর আগে বেনারসি কারিগর আরমানকে কেবল নাম-পরিচয়ের মিলের কারণে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করতে হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পান। ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, তদন্তে সামান্য ভুলও একজন নিরপরাধ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে দিতে পারে।
একই সময়ে সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের উৎপাদন এবং বিনিময়ভিত্তিক ‘নারকো-কারেন্সি’ অর্থনীতি মাদক সরবরাহকে আরও জটিল করে তুলেছে। অর্থাৎ উৎস, অর্থায়ন ও পাচারচক্র আন্তর্জাতিক; কিন্তু আইনের মুখোমুখি হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিচের সারির বাহক বা প্রান্তিক মানুষ।
আমাদের তদন্তব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা যা স্থায়ী কাঠামোগত সমস্যায় রূপ নিয়েছে। সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতি, আলামত সংরক্ষণে দুর্বলতা এবং প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতির কারণে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাদক মামলায় অভিযোগ প্রমাণ করা যায় না। ফলে রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল শাস্তি কঠোর করা নয়; বরং এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রকৃত অপরাধী আইনের আওতায় আসবে, আর নিরপরাধ কেউ তদন্তের দুর্বলতার শিকার হবে না।
মাদক সমস্যার আরেকটি সংবেদনশীল দিক প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়। কোনো সমাজে মাদকের চাহিদা হঠাৎ তৈরি হয় না। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, একাকিত্ব, মানসিক ট্রমা ও ভবিষ্যৎহীনতার অনুভূতি বহু মানুষকে ধীরে ধীরে নেশার দিকে ঠেলে দেয়। যে তরুণ প্রতিদিন অবহেলা বা সহিংসতার মধ্যে বড় হয়, তার কাছে মাদক অনেক সময় বাস্তবতা থেকে সাময়িক পালানোর ভ্রান্ত আশ্রয় হয়ে ওঠে।
তাই মাদক প্রতিরোধের আলোচনায় মানসিক স্বাস্থ্যকে আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একইসঙ্গে সামাজিক প্রতিরোধও হতে হবে দায়িত্বশীল। দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী জনসচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগ আশার আলো দেখাচ্ছে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, গুজবের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করা কিংবা ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে মাদকবিরোধী আন্দোলনের আড়ালে বৈধতা দেওয়া চলবে না। অপরাধের বিচার করবে রাষ্ট্র; নাগরিকের দায়িত্ব হবে তথ্য, সচেতনতা ও সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে সেই রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করা।
আমরা যদি সত্যিই মাদক নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, তাহলে শুধু পুলিশি অভিযান বা কঠোর আইনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের আরও গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে, কেন একজন মানুষ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সেই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণগুলোর সমাধান করতে পারলে মাদকের চাহিদাও অনেকটাই কমে আসবে।
নীতিনির্ধারকদের তাই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা, পরিবারকে আরও সহায়ক করে তোলা, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং পথশিশুসহ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সমাজকেও বুঝতে হবে, মাদক কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতার প্রতীক নয়; এটি গভীর সামাজিক অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ।
এখন সময় দোষারোপ বা কেবল শাস্তির প্রতিযোগিতা নয়; প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক নীতি, নিরপেক্ষ তদন্ত, ন্যায়ভিত্তিক বিচার এবং কার্যকর পুনর্বাসনের সমন্বিত কৌশল। কারণ মাদকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিজয় ফাঁসির মঞ্চে নয়, অপরাধচক্রের অর্থনৈতিক ভিত ধ্বংসে; শুধু গ্রেপ্তারে নয়, তরুণদের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরিতে। শাস্তির কঠোরতা নয়, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ও সামাজিক প্রতিরোধই হতে পারে মাদকের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর উত্তর।
মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর হতেই হবে, কিন্তু সেই কঠোরতা হতে হবে ন্যায়ভিত্তিক, প্রমাণনির্ভর এবং প্রকৃত অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে। কারণ ফাঁসির মঞ্চ একটি বাহককে থামাতে পারে; কিন্তু একটি আন্তর্জাতিক পাচারচক্রকে নয়।
বাংলাদেশের প্রকৃত বিজয় ঘটবে তখনই, যখন আইনের কঠোরতা প্রকৃত অপরাধচক্রকে আঘাত করবে, আর সমাজ এমন পরিবেশ গড়ে তুলবে যেখানে একজন তরুণের সামনে মাদক নয়, জীবনের পথই সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
কেকে/ এমএস