সাম্প্রতিক সময়ে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ঘিরে যে আন্দোলন দেখা গেল, তা নিছক একটি ‘পরীক্ষা বিতর্ক’ নয়- এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার গভীরে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যেও পরীক্ষা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত, পদার্থবিজ্ঞান প্রশ্নে ভুল, এবং এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় অভিমুখে ছাত্রছাত্রীদের দীর্ঘ পথযাত্রা- এ ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সবাইকে একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে : আমরা কি আমাদের সন্তানদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা রেখে যাচ্ছি, যেখানে ন্যায্য প্রক্রিয়া, দায়বদ্ধতা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক-নৈতিক গঠনতিনটিই সমান গুরুত্ব পায়!
আজকাল প্রায়ই শোনা যায়- ‘এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে চায় না, শুধু ভালো ফল চায়।’ এ ধারণাটি সহজ, কিন্তু বাস্তবতা তার চেয়ে জটিল। যখন লক্ষাধিক শিক্ষার্থী বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর সংগ্রাম করে, যখন একটি প্রশ্নপত্রে সুস্পষ্ট ভুল থাকে, তখন তাদের ক্ষোভকে শুধু ‘অবাধ্যতা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া ন্যায্য নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভুল স্বীকার করেছে, নির্দিষ্ট বোর্ডে কিছু বিষয়ের পরীক্ষা পুনরায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, আর মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এসব প্রমাণ করে যে, আন্দোলনের পেছনে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কোনো দাবি ছিল না-প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে বাস্তব ঘাটতি ছিল।
তবে অভিযোগ ন্যায্য হলেও, দীর্ঘমেয়াদে রাস্তায় আন্দোলন ও প্রতিবাদ কোনো শিক্ষার্থীর ঠিকানা হতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে, পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। প্রতিবাদের মাধ্যমে যে দাবিগুলো উঠে এসেছে, সেগুলোর সমাধান প্রশাসনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও শিক্ষক সমাজের। কিন্তু তার মানে শিক্ষাবর্ষ থমকে থাকা নয়। একটি জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে ধারাবাহিক অধ্যবসায়ে, রাজপথের দীর্ঘস্থায়ী উত্তাপে নয়। যারা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদী উসকানি বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেন, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন- কারণ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু শিক্ষার্থী ও তার একটি মূল্যবান শিক্ষাবর্ষ।
এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ প্রায়ই উপেক্ষিত অংশীদার হলেন অভিভাবক। একটি সচেতন অভিভাবক মহল সন্তানের মধ্যে লক্ষ্য স্থির করে দেওয়ার কাজটি সবচেয়ে ভালো করতে পারে। সন্তান কেন পড়বে, কী হতে চায়, জীবনের কোন অভিমুখে এগোতে চায়? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ছোটবেলা থেকেই স্পষ্ট হয়, তাহলে সাময়িক হতাশা বা বিভ্রান্তি তাকে সহজে পথ থেকে সরাতে পারে না। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত মন খুলে কথা বলা, তার ভয়-উদ্বেগ বোঝা, এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের বদলে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা। একইসঙ্গে সন্তানকে মহৎ মানুষদের জীবনী পড়তে উৎসাহ দেওয়া-বিজ্ঞানী, সমাজ সংস্কারক, মনীষী ও ইতিহাসের আদর্শ চরিত্রদের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প, তাকে ধৈর্য, লক্ষ্যনিষ্ঠা ও আত্মবিশ্বাসের শিক্ষা দিতে পারে, যা কোনো পরীক্ষার নম্বর দিতে পারে না।
শুধু নম্বর বা সার্টিফিকেট নয়, একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার চরিত্র ও মূল্যবোধের ওপর। ইসলামি শিক্ষা ও চিন্তাধারা এক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশনা দেয়- জ্ঞানার্জনকে ইবাদতের সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া, ধৈর্য ও অধ্যবসায়কে সাফল্যের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা, এবং শিক্ষককে সম্মান করাকে নৈতিক দায়িত্ব বিবেচনা করা। ইসলামের ইতিহাসে জ্ঞানচর্চাকে সবসময় সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে- এ চেতনা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারলে পড়াশোনা শুধু ফলাফলের প্রতিযোগিতা না হয়ে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্বে পরিণত হবে। পাশাপাশি সততা, বিনয়, পরিশ্রম ও সহমর্মিতার মতো সর্বজনীন মূল্যবোধ- যা প্রতিটি ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই সমাদৃত-শিক্ষার্থীদের মধ্যে গড়ে তোলা প্রতিটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, একটি সুস্থ সমাজে প্রতিটি অভিযোগের সমাধান রাস্তা অবরোধ বা মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের মধ্য দিয়েই হতে হবে- এমন সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাবর্ষের ধারাবাহিকতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। শিক্ষার্থী প্রতিনিধি, শিক্ষক সমাজ ও অভিভাবকদের গঠনমূলক সংলাপে এগিয়ে আসা জরুরি, যাতে ন্যায্য দাবি তার নিজস্ব শক্তিতেই আলোচনার টেবিলে জায়গা পায়- রাস্তা বন্ধ করার প্রয়োজন না পড়ে।
একটি পরীক্ষা ব্যবস্থা, একটি শিক্ষাবর্ষ, একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ- এসব কোনো একক পক্ষের দায়িত্ব নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত পরীক্ষা পরিকল্পনা, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও পূর্বপ্রস্তুতি বাড়ানো। রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে নিছক হুমকি হিসেবে না দেখে তার মূল কারণ অনুসন্ধান করা। আর শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে, প্রতিটি আন্দোলনকে অতীতের বড় কোনো গণআন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করে জনমনে ভীতি তৈরি করা তাদের ন্যায্য দাবিকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
কয়েকটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে :
বন্যাপ্রবণ এলাকা ও মৌসুম বিবেচনায় নমনীয় পরীক্ষাসূচি রাখা। ভুল প্রশ্ন এড়াতে স্বাধীন যাচাই কমিটি ও দ্রুত সংশোধন প্রক্রিয়া।
আন্দোলনে যাওয়ার আগেই অভিযোগ জানানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে অভিভাবকদের জন্য নিয়মিত পরামর্শ সেশন, যাতে তারা সন্তানের লক্ষ্য নির্ধারণ ও মানসিক স্বাস্থ্যে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন। পাঠ্যক্রমে মহৎ ব্যক্তিত্বদের জীবনী, নৈতিক শিক্ষা ও ইসলামি জ্ঞানচর্চার আদর্শ অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক চরিত্র গঠনে গুরুত্ব দেওয়া। সুতরাং, একটি প্রজন্মকে ভয় বা সন্দেহের চোখে দেখা সহজ, কিন্তু তা ভবিষ্যতের জন্য কোনো সমাধান বয়ে আনে না। যে শিক্ষার্থীরা বন্যার পানি ভেঙে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছায়, ন্যায্য মূল্যায়ন চায়- তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধের প্রমাণ আছে। এখন প্রয়োজন তাদের সেই শক্তিকে সঠিক পথে, অর্থাৎ ক্লাসরুমে, পড়ার টেবিলে, পরীক্ষায় এবং চরিত্র গঠনের পথে ফিরিয়ে আনা।
অভিভাবক, শিক্ষক, মন্ত্রণালয় ও শিক্ষার্থী-প্রত্যেকে যদি নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন, লক্ষ্য স্থির রাখেন এবং মহৎ আদর্শকে পাথেয় করেন, তাহলে আজকের এ সংকটই হয়ে উঠতে পারে আগামী দিনের সুশিক্ষিত, নীতিবান প্রজন্ম গড়ার সূচনা বিন্দু।
লেখক : ব্যাংক কর্মকর্তা
কেকে/ এমএস