আদিবাসী বলতে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের প্রাচীনতম জনগোষ্ঠীকে বোঝায়, যারা বহিরাগত বা ঔপনিবেশিক শক্তির আগমনের বহু আগে থেকেই সেই অঞ্চলে বসবাস করে আসছে এবং নিজেদের স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ও ঐতিহ্যগত জীবনধারা বজায় রেখেছে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৮৬ হাজার ১৪১ জন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১%। উল্লেখ্য, এ সংখ্যাটি দেশের সব ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর (সমতল ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উভয় অঞ্চল মিলিয়ে) জাতীয় হিসাব; তবে বিভিন্ন বেসরকারি ও আদিবাসী সংগঠনের মতে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখের কাছাকাছি হতে পারে বলে তারা দাবি করে।
সমতলের আদিবাসীদের প্রধান বাসস্থান উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর) এবং পূর্বাঞ্চলের (সিলেট ও ময়মনসিংহ) চা-বাগান ও বনভূমি এলাকা। এ জনগোষ্ঠী প্রধানত সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডা, গারো, হাজং, রাজবংশী, কোচ, খাসিয়া ও মণিপুরীসহ প্রায় ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে গঠিত।
জাতীয় আইন, বিভিন্ন চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারের রূপরেখা বর্ণিত আছে। ১৯৮৯ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘আদিবাসী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীবিষয়ক কনভেনশন’ আদিবাসীদের বৈষম্য থেকে সুরক্ষা দেয় এবং উন্নয়ন, প্রথাগত আইন, ভূমি, ভূখণ্ড ও সম্পদ, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে তাদের অধিকার সুনির্দিষ্ট করে। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণা’ গ্রহণ করে, যেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং নিজস্ব সংস্কৃতি, পরিচিতি, ভাষা ও আচার-অনুষ্ঠান রক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুযোগ লাভের অধিকারও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
আদিবাসী ধর্মবিশ্বাস : বৈচিত্র্যের এক জগৎ
‘আদিবাসী ধর্ম’ শব্দটি সাধারণত ছোট-বড় সমাজের স্থানীয় বিশ্বাস ব্যবস্থাকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। এ বিশ্বাস ব্যবস্থাগুলো সাধারণত ধর্মান্তরকরণে জড়িত হয় না। বাংলাদেশের প্রায় ৫০টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রধান কয়েকটির ধর্মবিশ্বাস নিচে দেওয়া হলো:
গারো : গারোদের প্রধান ও ঐতিহ্যবাহী ধর্ম সাংসারেক মূলত প্রকৃতি পূজার ওপর নির্ভরশীল এক ধরনের অ্যানিমিজম বা প্রাণবাদ। এখানে নির্দিষ্ট কোনো একেশ্বরবাদী স্রষ্টা নেই; বরং পাহাড়, নদী, গাছপালা ও বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিতে দেবদেবীর অস্তিত্ব কল্পনা করা হয়। তাদের প্রধান দেবতা রাবুগা (সৃষ্টিকর্তা) এবং সালজং (সূর্য ও উর্বরতার দেবতা)।
হাজং : হাজংদের প্রধান ও মূল ধর্ম হিন্দুধর্ম, যেখানে দুটি ধারার মিশ্রণ দেখা যায়। প্রথমত, সনাতন হিন্দুধর্ম তারা শাক্ত ও বৈষ্ণব মতাদর্শ অনুসরণ করে, শিব-বিষ্ণু-লক্ষ্মী-কামাখ্যার মতো দেব-দেবীর পূজা করে এবং রামায়ণ-গীতার মতো ধর্মগ্রন্থ পাঠ করে। দ্বিতীয়ত, প্রাক-হিন্দু বা আদিবাসী বিশ্বাস (অ্যানিমিজম) হিন্দুধর্মে দীক্ষিত হওয়ার আগের নিজস্ব প্রকৃতি-পূজা ও লোকবিশ্বাস, যা আজও হিন্দু রীতিনীতির সঙ্গে মিশে আছে।
রাজবংশী : রাজবংশীদের মূল ধর্মবিশ্বাস হিন্দুধর্ম ও প্রকৃতি পূজার সংমিশ্রণ। বেশির ভাগ রাজবংশী হিন্দু ধর্মাবলম্বী এবং প্রধানত শাক্ত (কালী, দুর্গা) ও বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী। এর পাশাপাশি তাদের মধ্যে প্রাচীন প্রকৃতি ও বৃক্ষ পূজার গভীর প্রভাব রয়েছে তারা অরণ্য, নদী, মাটি ও বিভিন্ন লৌকিক দেবতায় বিশ্বাসী এবং হুদুমা পূজা, বিষহরী বা মনসা পূজা, মাটির বাস্তুদেবতার মতো লোকজ আচার পালন করে।
মাহালি : মাহালিরা মূলত প্রকৃতি পূজারি, তবে অঞ্চল ও সংস্কৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিশ্বাসেও মিশ্রণ ঘটেছে। তাদের আদি ও প্রধান বিশ্বাস টোটেম বা প্রকৃতিকেন্দ্রিক উপাসনা প্রাকৃতিক শক্তি, বৃক্ষ ও পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং চন্দ্র-সূর্যকে (চান্দোবোংগা/সুর্জি দেবী) প্রধান দেবতা হিসেবে গণ্য করা। তাদের প্রধান উৎসবের মধ্যে রয়েছে গরয়া পূজা, করম পূজা ও সরহুল। সময়ের সঙ্গে অনেক মাহালি পরিবার হিন্দু দেব-দেবী ও লোকাচার গ্রহণ করেছে, ফলে মনসা পূজা, হরিপূজা ও টুসু পরবের মতো উৎসবও তাদের মধ্যে প্রচলিত হয়েছে।
সাঁওতাল : সাঁওতালরা মূলত প্রকৃতি পূজারি। তাদের নিজস্ব কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই। তাদের আদি ও ঐতিহ্যবাহী ধর্ম সারি বা সারনা ধর্ম নামে পরিচিত-তারা মূর্তি বা মন্দিরে পূজা করেন না, বরং প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানকে উপাস্য জ্ঞান করেন। তাদের সর্বোচ্চ ঈশ্বর সিং বোঙ্গা (সূর্যদেবতা) এবং সর্বোচ্চ দেবতা মারাং বুরু। গ্রামের বাইরের একটি পবিত্র শালবন তাদের উপাসনাস্থল, যাকে বলা হয় জাহের থান বা জাহের যুগ।
মুণ্ডা : মুণ্ডাদের মূল ধর্মবিশ্বাস সারনা ধর্ম নামে পরিচিত, যা মূলত প্রকৃতি ও টোটেমভিত্তিক। মুণ্ডা সমাজে একক বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্ম নেই, তবে তিনটি প্রধান ধারা লক্ষণীয় : প্রকৃতি-গাছপালা-বনভূমি-ভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং নিরাকার সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস; সিং বোঙ্গা বা সূর্যদেবতা যিনি পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা ও রক্ষাকর্তা এবং ধরতি আয়া বা ধরিত্রী মাতার পূজা; এবং প্রতিটি মুণ্ডা গ্রামে একটি নির্দিষ্ট পবিত্র শালবন, যা সারনা বা জহের নামে পরিচিত, যেখানকার ধর্মীয় আচার পরিচালনা করেন পাহান (পুরোহিত) ও পূজারি।
অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীরও অনুরূপ স্বতন্ত্র ধর্মবিশ্বাস রয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, সারা বাংলাদেশে আদিবাসীদের মধ্যে শতাধিক ধরনের স্থানীয় ধর্মবিশ্বাস প্রচলিত। কিন্তু বর্তমানে এ বিশ্বাসগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাওয়ার পথে, কারণ সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার ঘটছে যে ধর্মের সঙ্গে এ অঞ্চলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত কোনো যোগসূত্র নেই। বাংলাদেশের সমতলের প্রায় প্রতিটি আদিবাসী গ্রামে এখন একটি করে খ্রিষ্টান গির্জা গড়ে উঠেছে।
পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলোকে সাধারণত উৎস ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে দুটি প্রধান ধারায় ভাগ করা হয়:
ইব্রাহিমীয় বা সেমেটিক ধর্ম : মধ্যপ্রাচ্য থেকে উদ্ভূত এ ধর্মগুলো একই ঈশ্বর বা স্রষ্টায় বিশ্বাস করে এবং হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর বংশধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধারার প্রধান ধর্ম ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম ও ইহুদি ধর্ম।
প্রাচ্য বা ধার্মিক ধর্মীয় ঐতিহ্য : এ ধর্মগুলোর বেশির ভাগের উৎপত্তি ভারতীয় উপমহাদেশে। এগুলো মূলত কর্মফল, পুনর্জন্ম ও প্রকৃতির নিয়মে বিশ্বাস করে। এ ধারায় রয়েছে হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম, শিখধর্ম এবং আদিবাসীদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাসগুলো। উৎপত্তির অঞ্চল অনুযায়ী কেউ কেউ ধর্মকে পাশ্চাত্য (ইব্রাহিমীয়) ও প্রাচ্য (চীন-জাপানের তাওবাদ, কনফুসীয়বাদ ইত্যাদি) এই দুই ভাগেও আলোচনা করেন।
আদিবাসীদের মূল ধর্মীয় ধারায় বর্তমানে যে ধর্ম অনুপ্রবেশ করছে, তা ইব্রাহিমীয় ধারার খ্রিষ্টধর্ম যা আদিবাসীদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। সেমেটিক ধর্মীয় ধারা তুলনামূলকভাবে অনেক নবীন। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী, ভারতীয় উপমহাদেশে আদিম মানুষের (হোমো ইরেক্টাস) পদচারণা শুরু হয় লক্ষাধিক বছর আগে, আর আধুনিক মানুষের (হোমো সেপিয়েন্স) বসবাস শুরু হয় আজ থেকে প্রায় ৫৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার বছর আগে। তখন থেকেই এ অঞ্চলে আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় ধারা প্রচলিত ছিল।
অন্যদিকে ইব্রাহিমীয় ধর্মধারার সূচনা মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বছর আগে, হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর একেশ্বরবাদী আদর্শের ভিত্তিতে। এ ধারার প্রাচীনতম ধর্ম ইহুদি ধর্ম, যা হজরত মুসা (আ.)-এর মাধ্যমে সিনাই পর্বতে ঐশ্বরিক বাণী লাভের মধ্যদিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। দ্বিতীয় ধর্ম খ্রিষ্টধর্ম, যা হজরত ঈসা (আ.)-এর শিক্ষার ভিত্তিতে প্রায় দুই হাজার বছর আগে ফিলিস্তিন অঞ্চলে সূচিত হয়। তৃতীয়টি ইসলাম ধর্ম, যা ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর ঐশ্বরিক বাণী নাজিলের মধ্যদিয়ে প্রায় ১৪০০ বছর আগে প্রচলিত হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশে আদিবাসীদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও প্রথায় পরিবর্তনের সূচনা হয় আর্যদের আগমনের পর থেকে। ঐতিহাসিক ও ভাষাতাত্ত্বিক তথ্যমতে, ইন্দো-আর্যরা আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বছর আগে এ উপমহাদেশে প্রবেশ করে। তাদের আগমনে সরাসরি হিন্দুধর্মের উৎপত্তি ঘটেনি, বরং আর্যদের বৈদিক ধর্মবিশ্বাস ও স্থানীয় আদিবাসীদের (যেমন সিন্ধু সভ্যতার) বিশ্বাস-সংস্কৃতির মিশ্রণ বা সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে কালক্রমে হিন্দুধর্মের বিকাশ ঘটে। এই বিকাশের পর মূল আদিবাসীদের ধর্মীয় সংস্কৃতি ও প্রথায় বড় পরিবর্তন আসে, ফলে মূল আদিবাসী জনসংখ্যাও কমে যায়।
সপ্তম শতাব্দীতে আরব বণিকদের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের আগমন ও প্রচার শুরু হয়। পরে ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের মধ্যদিয়ে রাজনৈতিকভাবে এ অঞ্চলে মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশে (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান মিলিয়ে) মোট মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কোটি, যা বিশ্বের মোট মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এ অঞ্চলের বহু নিম্নবর্ণের হিন্দু ও আদিবাসী মানুষ সেসময় ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন।
এরপর ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, যদিও ব্রিটিশ বণিকরা এর অনেক আগে থেকেই এ উপমহাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। এসময় থেকে উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক অবসান ঘটতে শুরু করে। আদিবাসীদের প্রতি ব্রিটিশরা এক ধরনের সতর্কতা বজায় রাখত, যার একটি বড় কারণ ছিল হুল বিদ্রোহ (সাঁওতাল বিদ্রোহ নামেও পরিচিত)। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন আদিবাসীরা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং তাদের সহযোগী জমিদার-মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ শুরু করে, যা উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী প্রথম বড় সংগঠিত বিদ্রোহগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
সমতলের আদিবাসীদের (যেমন সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডা) খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরের কার্যক্রম মূলত শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, ১৮৯০-এর দশক থেকে ১৯০৩ সালের মধ্যে, এবং এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় উত্তরবঙ্গের রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলে। এই সময়ে (বিশেষত ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে) ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমি, আসাম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হন। ধর্মান্তরিত আদিবাসীদের সঠিক সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন, তবে ধারণা করা হয়, ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের মধ্যে এ সংখ্যা ছিল প্রায় এক থেকে দেড় লাখ।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ লাখ (দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.৩%)। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছেন বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায় থেকেগারো, মাহালি, সাঁওতাল, খাসিয়া ও ওঁরাওসহ সমতলের একাধিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এ সম্প্রদায়গুলো খ্রিষ্টধর্ম পালনের পাশাপাশি এখনো নিজেদের কিছু ঐতিহ্যগত রীতি ধরে রেখেছে, কিন্তু আশঙ্কা করা হচ্ছে, একটা সময় পর হয়তো এই স্বতন্ত্র প্রথাগুলো আর টিকবে না এবং পরবর্তী প্রজন্ম পুরোপুরি খ্রিষ্টান পরিচয়ে মিশে যাবে—যেমনটা ইতিহাসে আগেই ঘটেছে সনাতন ও ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়া এ অঞ্চলের আদিবাসীদের ক্ষেত্রে।
এখানেই মূল উদ্বেগের জায়গা। ধর্মান্তর নিজে থেকে কোনো অপরাধ নয়, এবং প্রতিটি মানুষের নিজস্ব বিশ্বাস বেছে নেওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু যখন একটি গোটা জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের প্রকৃতিকেন্দ্রিক, স্বতন্ত্র বিশ্বাস-ব্যবস্থা যার নিজস্ব কোনো লিখিত ধর্মগ্রন্থ নেই, যা টিকে থাকে মুখে মুখে, লোকাচারে ও সামাজিক স্মৃতিতে ক্রমে একেবারে হারিয়ে যাওয়ার পথে এগোয়, তখন তা শুধু ধর্মীয় পরিবর্তন থাকে না, হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও ভাষিক বৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি। আদিবাসীদের নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস, ভাষা ও লোকাচার সংরক্ষণের উদ্যোগ তাই শুধু ধর্মীয় প্রশ্ন নয় এটি জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নও বটে।
লেখক : কলামিস্ট
কেকে/ এমএস