উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে আবারও বেড়েছে তিস্তা নদীর পানি। চলতি মৌসুমে এটি সপ্তমবারের মতো পানি বৃদ্ধির ঘটনা। যদিও মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল, এরই মধ্যে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার তিস্তা অববাহিকার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো নদীপাড়ের মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, মঙ্গলবার ভোরে তিস্তার পানি বিপৎসীমার মাত্র ১ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। পরে কিছুটা কমলেও এর আগেই অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।
বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে সদ্য রোপণ করা আমনক্ষেত, বীজতলা ও সবজিখেত। উপচে পড়েছে শত শত মাছের পুকুর। এতে কৃষক ও মৎস্যচাষিদের কয়েক মাসের পরিশ্রম মুহূর্তেই পানিতে ভেসে গেছে।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পশ্চিম ইচলি গ্রামের কৃষক মহসীন আলী বলেন, “এ বছর সাতবার পানি উঠানামা করল। বাদাম তুলতে পারিনি, ভুট্টা নষ্ট হয়েছে। এখন নতুন লাগানো আমনও পানির নিচে। পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব, বুঝতে পারছি না।”
একই উপজেলার নোহালী ইউনিয়নের মৎস্যচাষি সৈয়দ আলী জানান, তার চার বিঘার মাছের পুকুরের সব মাছ স্রোতে ভেসে গেছে। ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
শুধু ফসল নয়, নদীভাঙনে বসতভিটাও হারাচ্ছেন অনেকে। নোহালী ইউনিয়নের কাচারীপাড়া গ্রামের সুলতানা বেগম বলেন, “চল্লিশ বছর ধরে যে বাড়িতে ছিলাম, পাঁচ দিনের ব্যবধানে সেটিও তিস্তা গিলে খেয়েছে। এখন মাথা গোঁজারও ঠাঁই নেই।”
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গঙ্গাচড়া উপজেলার নোহালী, কোলকোন্দ ও গজঘণ্টাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত ২০টি স্থানে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকির মুখে রয়েছে মহিপুর-তিস্তা সড়ক সেতুর রক্ষা বাঁধও। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা মেলেনি।
গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তালিকা প্রস্তুত করে জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডে পাঠানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, পানি বৃদ্ধি ও নদীভাঙনের পরিস্থিতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিস্তার দুই তীরের ২৪২ কিলোমিটার এলাকায় এ মৌসুমে অন্তত দেড় শতাধিক স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম জানান, পরিস্থিতি নিয়মিত মন্ত্রণালয়কে জানানো হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কেকে/ এমএস