এনজিও থেকে ঋণ দেওয়া হবে, দেওয়া হবে গরু ও নগদ অর্থ। সঞ্চয় করলে মিলবে লাভও— এমন নানা প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর প্রত্যন্ত গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে কয়েক দিনে ৪-৫ লাখ টাকা হাতিয়ে উধাও হয়ে গেছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। নিজেদের ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’-র কর্মী পরিচয় দিয়ে গ্রামের নারীদের বিশ্বাস অর্জনের পর সঞ্চয়ের নামে টাকা সংগ্রহ করে তারা গা-ঢাকা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চক্রটির হঠাৎ উধাও হওয়ার পর এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগীরা। কেউ ডিম-মুরগি বিক্রি করে টাকা জমিয়েছিলেন, কেউ সংসারের খরচ বাঁচিয়ে, আবার কেউ দীর্ঘদিনের কষ্টের সঞ্চয় তুলে দিয়েছিলেন কথিত এনজিওকর্মীদের হাতে। প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে অনেকের এখন দুচোখ অন্ধকার। টাকা হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অনেকে।
ঘটনাটি ঘটেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার করগাঁও ইউনিয়নের ভাট্রা, মিরেরপাড়া, মাগুরাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী দক্ষিণ ভাট্রা গ্রামের শহীদ মিয়ার স্ত্রী নার্গিস আক্তার শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কটিয়াদী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন আগে ৪-৫ জনের একটি দল করগাঁও ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ঘোরাফেরা শুরু করে। নিজেদের এনজিওকর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তারা স্থানীয়দের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে। একপর্যায়ে তারা নিজেদের ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’-র লোক দাবি করে মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে নিজেদের পরিচয় ও কার্যক্রম সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করে।
তাদের কথায়, এনজিও থেকে গ্রামের মানুষকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি দেওয়া হবে গরু, নগদ টাকা ও অন্যান্য সুবিধা। তবে এসব সুবিধা পেতে হলে আগে সঞ্চয় করতে হবে। প্রতি এক লাখ টাকা সঞ্চয়ের বিপরীতে বছরে ১০ হাজার টাকা লাভ দেওয়ার কথাও বলা হয়। লাভ ও ঋণের এমন প্রলোভনে গ্রামের অনেক নারী তাদের কথায় বিশ্বাস করেন। এরপর শুরু হয় টাকা সংগ্রহ। কারও কাছ থেকে ৫০ হাজার, কারও কাছ থেকে ৩০ হাজার, আবার কারও কাছ থেকে ১০-২০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই বিভিন্ন গ্রামের ২০-৩০ জন নারী-পুরুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করে চক্রটি।
টাকা নেওয়ার পর কথিত এনজিওকর্মীরা স্থানীয় মানিকখালী বাজারে তাদের অফিস রয়েছে বলে জানায়। কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দিনে সবাইকে সেখানে যেতে বলা হয়। নির্ধারিত দিনে ২০-৩০ জন নারী-পুরুষ মানিকখালী বাজারে গিয়ে তাদের কথিত অফিসে হাজির হন। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা যায়, অফিসে কেউ নেই। এরপর তাদের দেওয়া মোবাইল নম্বরে একের পর এক ফোন করতে থাকেন ভুক্তভোগীরা। কিন্তু সব নম্বরই বন্ধ।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও তাদের কোনো সন্ধান না পেয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। একপর্যায়ে সবাই বুঝতে পারেন, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
দক্ষিণ ভাট্রা গ্রামের শহীদ মিয়ার স্ত্রী নার্গিস আক্তারের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫০ হাজার টাকা। একই এলাকার সুকেল মিয়ার স্ত্রী সেলিনা দিয়েছেন ৩০ হাজার টাকা। মাগুরা গ্রামের রোজিনার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। এছাড়া আরও এক নারীর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকাসহ বিভিন্নজনের কাছ থেকে নানা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের কাছ থেকে নেওয়া টাকার পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। কারণ, প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই এখনও প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, প্রতারকরা মানিকখালী এলাকায় অফিস করার জন্য একটি বাসা ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলে তারা বাসা ভাড়ার বিষয়ে সম্মতও হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে গত সোমবার চুক্তি করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত দিনে তারা আর সেখানে আসেনি। বরং ওই দিন তাদের খোঁজে কয়েকজন নারী-পুরুষ ওই বাসায় গিয়ে জড়ো হন। পরে বাড়ির মালিকের পরিবারও বুঝতে পারে, পুরো বিষয়টির মধ্যে প্রতারণার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে মানিকখালী বাজারের ডেকোরেশন ব্যবসায়ী জামাল মিয়ার কাছ থেকেও তারা বিভিন্ন মালপত্র নিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সেসব মালপত্রের ভাড়াও পরিশোধ না করে তারা উধাও হয়ে যায়।
ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তার বলেন, ‘তিল তিল করে কষ্টে জমানো টাকা নিয়ে ওরা উধাও হয়ে গেছে। ফোন করলে তাদের সব নম্বর বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এখন আমাদের সব শেষ। টাকা কীভাবে ফেরত পাব, তা নিয়ে চিন্তার মধ্যে আছি।’
আরেক ভুক্তভোগী সেলিনা বলেন, ‘ডিম-মুরগি বিক্রি করে কষ্ট করে টাকা জমিয়েছিলাম। তাদের কথা বিশ্বাস করে সেই টাকা দিয়েছি। এনজিওর লোকজন তো এভাবেই এলাকায় আসে। আসল-নকল আমরা সাধারণ মানুষ কীভাবে চিনব? আমরা টাকা ফেরত চাই, পাশাপাশি তাদের কঠিন বিচার চাই।’
মানিকখালী বাজারসংলগ্ন বাসার মালিকের ছেলে মফিজুর রহমান সারুফ বলেন, ‘আমাকে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকতে হয়। জয়িতা ফাউন্ডেশনের এনজিও কর্মী পরিচয় দিয়ে তারা আমার মায়ের কাছে অফিস ভাড়া নিতে আসে। পরে কাগজপত্র দিয়ে সোমবার চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কথা থাকলেও তারা আর আসেনি। ওই দিন তাদের খোঁজে আরও অনেক নারী-পুরুষ আসেন। পরে আমরা বুঝতে পারি, বিষয়টি প্রতারণার। এদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। আমার ধারণা, তারা বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধভাবে এমন প্রতারণা করে আসছে।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে কথিত এনজিওকর্মী আতিক হাসান ওরফে আতিকুরের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হয়। চক্রের আরেক সদস্য জহিরুল ইসলামের নম্বরেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
করগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাদিম মোল্লা বলেন, ‘ঘটনার পর একজন ভুক্তভোগী আমাকে মৌখিকভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এলাকায় যাতে এমন প্রতারণা না হয়, সে জন্য মানুষকে সচেতন করা হবে।’
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে প্রলোভনের মাধ্যমে একটি চক্র এনজিও পরিচয় ব্যবহার করে অপকর্ম করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন ও সজাগ থাকা জরুরি। অভিযোগের বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।’
কেকে/এআই