সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয় (গবি) প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ হিসেবে পরিচালিত হলেও এবার নিয়মনীতি ভঙ্গ করে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। গত বছর ২০২৫ সালের ১২ জুন আংশিক কমিটি ঘোষণা করেছিল সংগঠনটি। এর আগে বুধবার (১৫ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এমনকি ভর্তি ফরমে শিক্ষার্থীদের অঙ্গীকারনামার মাধ্যমেও দলীয় রাজনীতি থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ হিসেবেই পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নীতি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি ‘রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস’ হিসেবে পরিচালিত হওয়ার কথা। তবে গত কয়েক বছরে এসব নীতি অমান্য করে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে কমিটি ঘোষণা করেছে। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার পরিপন্থী বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা।
গত শনিবার (১৮ জুলাই) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. আবু হুরায়রা ও এম. রাজিবুল ইসলাম তালুকদার (বিন্দু) স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে গণ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের ৮৫ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদনের তথ্য জানানো হয়।
প্রকাশিত কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে মো. নির্জনকে এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আসাদুর রহমান বিজয়। সিনিয়র সহসভাপতি হয়েছেন মো. মামুন হোসেন খান এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মো. আব্দুল্লাহ আল রাইভার।
এ ছাড়া সহসভাপতি পদে রয়েছেন আব্দুল্লাহ আল রাকিব, মো. রাকিবুল হাসান, তারেক রহমান, রাইহানুল ইসলাম রায়হান, মো. রাকিবুল হাসান খান, হৃদয় হাসান, জামিল রাকিব, ফেরদৌস নিয়াম, শিফাতুর রহমান শিশির, মারুফ হাসান রুম্মান, শিহাব উদ্দিন, ইব্রাহিম খলিল, তাওহীদুল ইসলাম, মনোয়ার হোসেন অন্তর, খালিদ বিন মাসুদ ও জাহিদ হাসান।
কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রাখা হয়েছে মো. আকরাম হোসেন, মাসফিক শাহাদাত, মেহেদী হাসান, রওনক জাহান রুবক, আশরাফুল ইসলামসহ একাধিক নেতাকে। পাশাপাশি সহসাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক, সহসাংগঠনিক সম্পাদক, দপ্তর, মানবাধিকার, সাহিত্য ও প্রকাশনা, প্রচার, তথ্য ও যোগাযোগ, আইন এবং ছাত্রবিষয়ক সম্পাদকসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্যও রাখা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ২০২৫ সালের ১২ জুন প্রথমবারের মতো কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের কমিটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তবে গত ১০ মাসে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংগঠনটির কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সভাপতি মো. নির্জন বলেন, ‘রাজনীতি করা প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক অধিকার। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ও নিয়মনীতির প্রতি সম্মান রেখে আমরা ক্যাম্পাসের ভেতরে ছাত্রদলের কোনো ধরনের কর্মসূচি করছি না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বজায় রাখতে আমাদের সব সাংগঠনিক কার্যক্রম ক্যাম্পাসের বাইরেই সম্পন্ন করছি।’
এর আগে গত বুধবার (১৫ জুলাই) বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের প্যাডে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ১১ সদস্যের গণ বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়। এতে সভাপতি নির্বাচিত হন তাওহীদ আহমদ সালেহীন এবং সাধারণ সম্পাদক হন জান্নাতুল ফেরদৌস রিয়া।
রাজনীতি নিষিদ্ধ একটি ক্যাম্পাসে অল্প সময়ের ব্যবধানে ছাত্রদল ও ছাত্র ফেডারেশনের কমিটি ঘোষণার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ব্যানারে কোনো ধরনের কর্মসূচি পালন এবং গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো ব্যবহার করে রাজনীতি করা যাবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম না চালাতে শিক্ষার্থীদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হবে। দলীয় রাজনীতি প্রবেশ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি-শৃঙ্খলা ও শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’
রাজনীতি নিষিদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর কমিটির বিষয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা নিষিদ্ধ। সে ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে বা বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন কার্যক্রম পরিচালনা করতে চাইলে ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে।’
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ শাসনামলে বা এর বাইরে কখনোই ছাত্রলীগ, শিবির কিংবা অন্যান্য সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রকাশ্যে কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। যদিও বিভিন্ন সময়ে কিছু সংগঠন ‘ভিন্ন নামে’ সীমিত আকারে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়েছে।
কেকে/ এমএস