স্বামী হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এরই মধ্যে টানা বর্ষণে ভেঙে পড়েছে মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও। জীবনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলা তিন কন্যাসন্তানের জননী বিধবা জুহুরা খাতুনের চোখে এখন শুধুই অনিশ্চয়তা আর বেঁচে থাকার আকুতি।
বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার পার্শ্ববর্তী কক্সবাজারের রামু উপজেলার গর্জনিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গম থোয়াঙ্গাকাটা মৌলভী ঘোনা গ্রামের এই অসহায় নারীর জীবন যেন দুঃখ-কষ্টের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। স্বামী হারানোর পর যে সংসার কোনোমতে টিকে ছিল, সাম্প্রতিক টানা ভারী বর্ষণ সেই সংসারের শেষ সম্বলটুকুও কেড়ে নিয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ঘেরা জনপদের এক কোণে বাঁশ, পলিথিন ও জীর্ণ কাঠ দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি বসতঘর। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ঘরের পলিথিনের ছাউনি ছিঁড়ে গেছে। বাঁশের বেড়া ভিজে উইপোকার আক্রমণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে পানি জমে রয়েছে। শুকনো থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। ভেজা মাটির ওপরেই কাটছে দিন-রাত।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুই বছর আগে জুহুরা খাতুনের স্বামী মো. হাবিবুর রহমান (প্রকাশ ভুলা) মারা যান। জীবিত অবস্থায় তিনি বাইশারী বাজারে পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করে অতি কষ্টে সংসার চালাতেন। তার মৃত্যুর পর উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে জুহুরা খাতুনের পরিবার চরম সংকটে পড়ে।
সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হন জুহুরা। কখনো রাবার বাগানে ঝোপঝাড় পরিষ্কারের কাজ করেন, কখনো মানুষের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সন্তানদের মুখে দুমুঠো খাবার তুলে দেন। এরই মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ের বয়স হলে ধারদেনা করে তাকে বিয়ে দিতে হয়েছে। সেই ঋণের বোঝা এখনো কাঁধে বহন করছেন তিনি।
এদিকে, সপ্তাহজুড়ে চলা ভারী বর্ষণে তার বসতঘর প্রায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। ঘরটি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেলে স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ও প্রতিবেশী এগিয়ে এসে নিজেদের উদ্যোগে সাময়িকভাবে নতুন পলিথিন টাঙিয়ে রাত কাটানোর ব্যবস্থা করে দেন। তবে সেটিও সাময়িক সমাধান। আবার বৃষ্টি হলে একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন অসহায় একটি পরিবার বছরের পর বছর মানবেতর জীবন কাটালেও সরকারি সহায়তা তাদের ভাগ্যে জোটেনি। জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলেও দাবি করেন তারা।
জুহুরা খাতুনের মতো অসহায় মানুষের জন্য সরকারি আবাসন, মানবিক সহায়তা কিংবা জরুরি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। স্থানীয়দের ভাষ্য, একটি নিরাপদ ঘরই বদলে দিতে পারে এই পরিবারটির জীবন।
বিধবা জুহুরা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে খুব কষ্টে দিন কাটছে। মানুষের বাড়িতে কাজ করি, কখনো রাবার বাগানে কাজ করি। যা পাই, তাই দিয়ে খাই। এখন বৃষ্টিতে ঘরটাও নষ্ট হয়ে গেছে। রাতে ঘুমাতে ভয় লাগে। মেয়েদের নিয়ে কোথায় থাকব বুঝতে পারি না। সরকারের কাছে আমার একটাই আবেদন—আমাদের মাথা গোঁজার জন্য একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দিন।’
স্থানীয় তরুণ সমাজসেবক মো. হামিদুল হক বলেন, ‘জুহুরা খাতুনের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। টানা বৃষ্টিতে তার ঘর একেবারে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যায়। আমরা কয়েকজন মিলে আপাতত পলিথিন দিয়ে থাকার মতো ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত এগিয়ে এলে একটি অসহায় পরিবার নতুন করে বাঁচার সুযোগ পাবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গর্জনিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আব্দুল জব্বার বলেন, ‘তাকে ঠিক চিনতে পারছি না। কোন জুহুরা খাতুনের কথা বলছেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে বিষয়টি দেখব।’
গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. মনিরুল আলম বলেন, ‘বিষয়টি আপনার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। আমরা পরিষদের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে বিধবা জুহুরা খাতুনকে যথাসম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। পাশাপাশি সরকারি সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
একদিকে স্বামী হারানোর বেদনা, অন্যদিকে দারিদ্র্য আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের নির্মম আঘাত—সব মিলিয়ে জুহুরা খাতুনের জীবন যেন অন্তহীন সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবে কতটা স্বস্তি এনে দিতে পারে এই অসহায় পরিবারটির জীবনে।
কেকে/ এমএস