বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক, প্রগতিশীল ও বাম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারার অন্যতম শীর্ষ নেতা সাইফুল হকের ৭০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হয়েছে।
রোববার (২৬ জুলাই) বিকাল ৪টায় রাজধানীর তোপখানা রোডে কালের দাবি’র কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, কবি, সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সহযোদ্ধাসহ তিন শতাধিক অতিথি অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে ‘সাইফুল হক : যে জীবন মানুষের তরে’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। পরে উৎসবমুখর পরিবেশে সাইফুল হকের জন্মদিনের কেক কাটা হয়।
কালের দাবি প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত ‘সাইফুল হক : যে জীবন মানুষের তরে’ সংকলনে সাইফুল হকের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, আদর্শ, সংগ্রাম ও বাংলাদেশের প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারায় তার অবদানকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিক, গবেষক, লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও সহযোদ্ধাদের নিবন্ধ, মূল্যায়ন, স্মৃতিচারণ, সাক্ষাৎকার, আত্মকথনের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে একটি কালপঞ্জি সংযোজিত হয়েছে।
কালের দাবি প্রকাশনা জানিয়েছে, সাইফুল হককে কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও সমাজমুখী রাজনৈতিক ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তক, সংগঠক ও সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব হিসেবে মূল্যায়নের প্রয়াস থেকেই এ সংকলন প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তার রাজনৈতিক দর্শন, সংগ্রাম ও জনসম্পৃক্ত রাজনীতির অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ, গণফোরামের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, অধ্যাপক ড. সলিমুল্লাহ খান, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিষদের আহ্বায়ক শেখ আবদুন নূর, কবি মোহন রায়হান, পদাতিক নাট্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক দিপু, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ বেলায়েত হোসেন বেলাল এবং কালের দাবি’র সম্পাদক বহ্নিশিখা জামালী।
বক্তারা সাইফুল হককে বাংলাদেশের আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতির অন্যতম প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেন।
তারা বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে ধারাবাহিক ভূমিকা রেখে চলেছেন।’
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও গণতন্ত্র, রাষ্ট্র সংস্কার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে জাতীয় ঐক্য অটুট রাখার ওপর বক্তারা গুরুত্বারোপ করেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘জীবনের এমন দিন প্রতিদিন ফিরে আসে না।’
তিনি বিএনপি ও তারেক রহমানের সাফল্য কামনা করার পাশাপাশি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে গঠনমূলক সমালোচনার চর্চা থাকতে হবে; চাটুকারিতার মাধ্যমে কোনো জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।’
সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘সাইফুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় প্রায় পাঁচ দশকের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন থেকেই আমি সাইফুল হককে অত্যন্ত শান্ত, সংযত, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও সুসংগঠিত একজন মানুষ হিসেবে দেখে আসছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাইফুল হকের জন্মদিন ২৬ জুলাই, যা ঐতিহাসিক ২৬ জুলাই আন্দোলনের তারিখের সঙ্গে এক অনন্য ঐতিহাসিক মিল বহন করে।’
এ প্রসঙ্গে সলিমুল্লাহ খান কিউবার বিপ্লব ও ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে পরিচালিত ২৬ জুলাই আন্দোলনের কথা স্মরণ করেন।
পাশাপাশি ছাত্রজীবনে সাইফুল হকের সংগঠকসুলভ নেতৃত্বের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আদর্শ ও শৃঙ্খলার সমন্বয়ে তিনি ছাত্রজীবন থেকেই একজন ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।’
আবু সাঈদ খান বলেন, ‘জীবিত অবস্থায় একজন রাজনৈতিক নেতাকে নিয়ে এমন গবেষণাধর্মী সংকলন প্রকাশ একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান দলিল হয়ে থাকবে।’
বহ্নিশিখা জামালী বলেন, ‘এই সংকলনের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিকে মহিমান্বিত করা নয়; বরং একজন আদর্শনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মীর দীর্ঘ সংগ্রাম, রাজনৈতিক দর্শন, চিন্তাচর্চা ও জনসম্পৃক্ত রাজনীতির অভিজ্ঞতাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দলিল আকারে তুলে ধরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘আদর্শভিত্তিক রাজনীতির চর্চা ও ইতিহাস সংরক্ষণে এই গ্রন্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তাদের বিশ্বাস।’
সাইফুল হক বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং দীর্ঘ ১৭-১৮ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশে নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি ও তারেক রহমানের সামনে এখন একটি প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্র গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। তারা প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সঙ্গে জনগণের এই প্রত্যাশাকে বাস্তবায়ন করতে পারলে ইতিহাসে তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের দুই বছর পরও দারিদ্র্য, কর্মহীনতা, মূল্যস্ফীতি ও শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার মতো সংকট রয়ে গেছে। বিদেশে অর্থ পাচার, আর্থিক খাতের অনিয়ম ও লুটপাটের বিরুদ্ধে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
একই সঙ্গে হত্যা, চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান সাইফুল হক।
কেকে/এমএ