হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের মেডিকেল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের ডা. সাখি আজাদ বলেছেন, হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা। বিশেষ করে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া গেলে রোগ প্রতিরোধে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব।
সোমবার (২৭ জুলাই) বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. এবিএম খোরশেদ আলম ভূঞা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক একেএম মাজহারুল ইসলাম, শ্যামলী টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার, সূর্যের হাসি নেটওয়ার্কের মো. আবদুল কাদের ভূঁইয়া, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. দীপক কুমার মিত্র, ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, খোলা কাগজের নির্বাহী সম্পাদক মো. মনির হোসেন, প্রধান বার্তা সম্পাদক মো. সফিকুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক প্রণব আচার্য্য ও মো. রবিউল ইসলাম, প্রধান প্রতিবেদক আলতাফ হোসেনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।
ডা. সাখি আজাদ বলেন, বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস প্রতিবছর ২৮ জুলাই উদযাপন করা হয়। হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কার এবং এর প্রতিরোধে অবদান রাখা বিজ্ঞানীর জন্মদিনকে স্মরণ করার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়াতেই এ দিবস পালন করা হয়।
তিনি বলেন, হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের অন্যতম বড় সমস্যা হলো, আক্রান্ত অনেক রোগী নিয়মিত চিকিৎসা সম্পন্ন করেন না। মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। ফলে পরিবারের সদস্যসহ ঘনিষ্ঠদের মধ্যে সহজেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় ৯ লাখ মানুষ এ রোগে মারা যায়। হেপাটাইটিস বি সংক্রমণ থেকে দীর্ঘমেয়াদে লিভারের জটিলতা, সিরোসিস, এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার প্রায় ৬ শতাংশ। অন্যদিকে হেপাটাইটিস সি-সংক্রান্ত নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা মাত্র ৮ হাজার ২৯৬ জন। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। কারণ, দেশে পর্যাপ্ত গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও ডাটা এন্ট্রির ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ২০০৫ সাল থেকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ৪২ দিন বয়স থেকে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার সঙ্গে হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া হচ্ছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে পেন্টাভ্যালেন্ট টিকার সরবরাহ নিয়মিত থাকে না। ফলে অনেক শিশু প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পর তৃতীয় ডোজ সম্পন্ন করতে পারে না। অনেক অভিভাবকও প্রথম ডোজ দেওয়ার পর আর টিকাকেন্দ্রে ফিরে আসেন না।
তিনি বলেন, সরকারিভাবে হেপাটাইটিস বি টিকার তিন ডোজের ৯৮ শতাংশ কভারেজের কথা বলা হলেও বাস্তবে পূর্ণ তিন ডোজ সম্পন্নের ক্ষেত্রে আরও সচেতনতা ও নজরদারি প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে প্রায় ৫ হাজার প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন।
ডা. সাখি আজাদ বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর কত মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত হচ্ছেন, কতজন দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় ভুগছেন কিংবা কতজন মারা যাচ্ছেন, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। গবেষণা ও নির্ভরযোগ্য ডাটা সংগ্রহের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে।
তিনি জানান, স্বাস্থ্যকর্মী, জনসেবামূলক পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তি, ডায়ালাইসিস রোগী, ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে কাজ করেন—এমন পেশাজীবী, যেমন বিউটিশিয়ানসহ বিভিন্ন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
তিনি বলেন, হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি না করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. সাখি আজাদ বলেন, রোগ নির্ণয়ের পর চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত একটি বড় ফাঁক থেকে যায়। এ সময় অনেক রোগী কবিরাজি চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আবার সামাজিক কারণে অনেকে নিজের সংক্রমণের বিষয়টি গোপন রাখেন। এমনকি কিছু রোগী হাসপাতালে অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কায় হেপাটাইটিস বি পজিটিভ হওয়ার তথ্যও গোপন করেন। এ গ্যাপগুলো পূরণ করতে না পারলে রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ১৯৯২ সাল থেকেই জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়ার সুপারিশ করে আসছে। ২০১৭ সালের ডব্লিউএইচও পজিশন পেপারেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ৪২ দিন বয়স থেকে টিকাদান শুরু হয়।
তিনি বলেন, যেভাবে প্রতিটি নবজাতককে জন্মের পরপরই ভিটামিন কে দেওয়া হয়, একইভাবে দেশের প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি টিকা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণ প্রতিরোধে বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
টিকাদানের সময়সূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, জন্মের সময় প্রথম ডোজ, এক মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ এবং ছয় মাস পরে তৃতীয় ডোজ দিতে হবে। প্রয়োজনে এক বছর পর বুস্টার ডোজও নেওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, আগে টিকা নেওয়া অনেকের শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। তাই প্রয়োজনে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে পুনরায় টিকা নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. সাখি আজাদ বলেন, ডায়ালাইসিস রোগীদের ক্ষেত্রে রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা থাকায় তাদের জন্য বর্তমানে ডাবল ডোজ হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন ব্যবহার করা প্রয়োজন।
কেকে/এলএ