সরকারি অর্থে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছিল বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাইশারী-ঈদগড় সড়কের একটি অংশ। উদ্দেশ্য ছিল সীমান্তবর্তী এলাকার হাজারো মানুষের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করা। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার আনুমানিক দুই মাসের মধ্যেই সেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিম্নমানের কাজের কারণেই এত অল্প সময়ে সড়কটি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) নাইক্ষ্যংছড়ি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বাইশারী-ঈদগড় সড়কের বৈদ্যপাড়া রাস্তার মাথা থেকে ঈদগড় বাজারের গরুর বাজার পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার কার্পেটিং সংস্কার করা হয়। কাজটি বাস্তবায়ন করে চট্টগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঈদগড় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনে সড়কের কার্পেটিং উঠে অন্তত তিনটি বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। পানিস্যাঘোনা জামে মসজিদের সামনের অংশেও একই চিত্র। আরও কয়েকটি স্থানে কার্পেটিং আলগা হয়ে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, হাত দিয়েই কার্পেটিংয়ের স্তর উঠিয়ে ফেলা যাচ্ছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন, একটি সরকারি প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি দুই মাসের মধ্যে সড়কের এই অবস্থা হয়, তাহলে নির্মাণকাজে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বর্তমানে চলমান ভারী বর্ষণের কারণে গর্তগুলোতে পানি জমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। প্রতিদিন যানবাহনের চাপে গর্তের পরিধি বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে জনভোগান্তিও বাড়ছে।
নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ চলাকালীন সময়েও তারা নির্মাণের মান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের বক্তব্য আমলে নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দা বাদশা, মো. হাকিম ও এন. আলম বলেন, ‘কাজ করার সময়ই আমরা বলেছিলাম, মান ঠিক নেই। কিন্তু তখন কেউ গুরুত্ব দেয়নি। এখন কাজ শেষ হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার আসল চিত্র বের হয়ে এসেছে।’
পথচারী মো. মিজবাহ ও মো. মিলনের ভাষ্য, সরকার উন্নয়নের জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু যদি সেই কাজ টেকসই না হয়, তাহলে জনগণের কষ্ট বাড়বে এবং সরকারের অর্থও অপচয় হবে।
প্রতিদিন এই সড়কে চলাচলকারী সিএনজি চালক মো. ফয়সাল, মো. হামিদ ও মো. আবছার বলেন, ‘আগে রাস্তা তুলনামূলক ভালো ছিল। এখন নতুন কার্পেটিংই উঠে যাচ্ছে। বর্ষায় গর্তে পানি জমে কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত, তা বোঝা যায় না। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে।’
তাদের অভিযোগ, এত দ্রুত রাস্তা নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক নয়। বিষয়টি তদন্ত হওয়া উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনি সংবাদ প্রকাশ না করলেও ভালো হয়। কার্পেটিং উঠে যাওয়া স্থানের ছবি, ভিডিও, লোকেশন ও প্যাকেজ নম্বর পাঠিয়ে দিন। আমরা দ্রুত পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের ব্যবস্থা নেব।’
কাজটির তদারকিতে থাকা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা এলজিইডি অফিসের সহকারী প্রকৌশলী মো. রবিউল আলম বলেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে সড়কের কার্পেটিংয়ের কিছু অংশ উঠে যাচ্ছে। বর্তমানে টানা বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে মেরামতকাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না। বৃষ্টি কমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় মেরামত করা হবে।’
এদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. নজরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে এর আগে কার্যালয়ে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা ওই কাজের দায়িত্বে ছিলেন, তারা এখন অফিসে নেই। তারা এলে বিস্তারিত জেনে জানানো হবে।’
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের নির্মাণমান, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান, কাজের তদারকি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো পুনরায় মানসম্মতভাবে সংস্কার এবং দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জন্য বাইশারী-ঈদগড় সড়কটি একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। তাই এই সড়কের টেকসই সংস্কার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
কেকে/এমএস