কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং বালি-মাটি উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্রের নেতৃত্বে বছরের পর বছর ধরে বনের জমি দখল করে মুরগির খামার, ফলের বাগান গড়ে তোলা হচ্ছে। এ ঘটনায় বন বিভাগ ও পুলিশ একাধিক মামলা করলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দখল ও অবৈধ কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে দেখা যায়, খুটাখালী ইউনিয়নের নরপাড়ি, গোদারপাড়ি, হরিখোলা ও কচুতলিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমির বিস্তীর্ণ অংশ দখল করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো গাছপালা কেটে বনভূমি সমতল করে সেখানে মুরগির খামার ও ফলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া খুটাখালী ছড়া খাল ও আশপাশের এলাকা থেকে দিন-রাত স্কেভেটর ও ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালি ও মাটি উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এতে বনাঞ্চল, পরিবেশ এবং বসতভিটা হুমকির মুখে পড়ছে।
একাধিক মামলা
প্রতিবেদকের হাতে আসা বন বিভাগ, চকরিয়া থানা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, অভিযুক্ত মোহাম্মদ আলী লিটন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বন আইনে একাধিক মামলা রয়েছে।
বন মামলা নং-১৭/ফুল-বি (২৮ জানুয়ারি ২০২৪)-তে হরিখোলা এলাকায় সংরক্ষিত বনে অবৈধ প্রবেশ, বালু উত্তোলন ও মাটি পাচারের অভিযোগে মোহাম্মদ আলী লিটন ও তাঁর ভাই মো. ইব্রাহিমকে আসামি করা হয়।
বন মামলা নং-১৮/ফুল-বি (২৯ জানুয়ারি ২০২৪)-তে গোদারপাড়ি এলাকায় বনভূমি পরিষ্কার, মাটি কেটে সমতল করা এবং মুরগির খামার নির্মাণের অভিযোগ আনা হয়।
বন মামলা নং-১৯/ফুল-বি (২৭ জানুয়ারি ২০২৪)-তে বনভূমি সমতল করে চাষাবাদের অভিযোগে লিটন, ইব্রাহিম ও ইকবালকে আসামি করা হয়।
এ ছাড়া বন মামলা নং-১৩/ফুল-বি (৭ ডিসেম্বর ২০২৩)-তে কচুতলিয়া এলাকায় গাছ কেটে ফলের বাগান তৈরির অভিযোগে লিটন ও জালাল ড্রাইভারের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।
চকরিয়া থানায় দায়ের করা জিআর নং-৩৭/৩১৬ (২৩ জুলাই ২০২৬) মামলায় এক আইনজীবীর পরিবারের ওপর হামলা, বাছুর হত্যা ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে লিটনসহ ৮-১০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২৪ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে অভিযোগ করা হয়, লিটনের নেতৃত্বে একটি চক্র ড্রেজার ও স্কেভেটর দিয়ে মানুষের বসতভিটা ও খতিয়ানভুক্ত জমি থেকে জোরপূর্বক বালি ও মাটি উত্তোলন করছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ
আইনজীবী ইয়াসমিন আক্তার হ্যাপী বলেন, ‘লিটন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। বনভূমি দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি আমার মহিষের পাল সেখানে গেলে একটি বাছুরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এবং আরেকটি নিখোঁজ রয়েছে।’
অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল চলছে। মাঝে মধ্যে মামলা হলেও কার্যকর উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয় না। দখলের প্রতিবাদ করলে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে পড়তে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত ১৬ জুলাই পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে এলাকাবাসীর দেওয়া এক আবেদনে উল্লেখ করা হয়, খুটাখালী মৌজার প্রায় ১৫ একর সরকারি বনভূমির সালবাগান কেটে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ফলের বাগান গড়ে তোলা হয়েছে।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. মারুফ হোসেন বলেন, ‘তার নামে আমরা একাধিক মামলা করেছি। মামলা করার পরও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বা আদালত কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সে বিষয়ে আদালতের কাছেই জানতে হবে।’
অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ আলী লিটন বলেন, ‘আমি কোনো বনভূমি দখল বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। একটি মহল আমাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছে।’
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, খুটাখালী ও ফুলছড়ি রেঞ্জে বনভূমি দখল ও অবৈধ বালি উত্তোলনের ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পরিবেশ ও বন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট অসাধুদের চিহ্নিত করে দ্রুত যৌথ প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কেকে/ এমএস