ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার আট নম্বর আমিরাবাদ ইউনিয়নের চরলামছি গ্রামের আউটার বেড়িবাঁধ রক্ষায় সরকারি বরাদ্দে ফেলা বালু রাতের আঁধারে কেটে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় অবশেষে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। দৈনিক খোলা কাগজে সংবাদ প্রকাশের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা। পরিদর্শন শেষে অভিযুক্তদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বেড়িবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে পূর্বের ন্যায় বালু ভরাট করার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গেল ৩ মার্চ আমিরাবাদ ইউনিয়নের বড় ফেনী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও নদী দখলের অভিযোগে ভূমি কর্মকর্তা বাদী হয়ে নুর উদ্দিন, নুরুজ্জামান, মহিউদ্দিন মহিন, নিজাম উদ্দিন, নুরুল আফছার টিপুসহ ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ৫৫ জনকে আসামি করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।
তবে মামলার আসামিদের কেউ কেউ জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় বেড়িবাঁধের বালু লুটে জড়িয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চরকৃষ্ণজয় ও চরলামছি গ্রামের বড় ফেনী নদীর পূর্ব পাশে নদীভাঙন থেকে আউটার বেড়িবাঁধ রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের আওতায় সরকারি অর্থায়নে জিও ব্যাগ ও বালু ফেলা হয়। সরকারের কোটি কোটি টাকার এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল নদীভাঙনের হাত থেকে বেড়িবাঁধ, জনপদ ও কৃষিজমি রক্ষা করা। কিন্তু একটি সংঘবদ্ধ চক্র রাতের আঁধারে স্কেভেটর ব্যবহার করে ড্রাম ট্রাকে বালু কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্প ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ‘ফাইভ লিংক’ নামে পরিচিত সিন্ডিকেট নুর উদ্দিন, নুরুজ্জামান, মহিউদ্দিন মহিন, নিজাম উদ্দিন ও হোসাফ গ্রুপের ময়নার টেক বাগানবাড়ির দারোয়ান নুরুল আফছার টিপু)র নেতৃত্ব বা ইন্ধনে এই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি একাধিকবার উপজেলা প্রশাসনকে জানানো হলেও দীর্ঘদিন বালু লুট পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
ফলে বেড়িবাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বেড়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আফছার হোসেন টিপু নিজেকে কখনো যুবদল নেতা, কখনো হোসাফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), আবার কখনো গ্রুপটির ম্যানেজার পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন।
তাদের দাবি, হোসাফ গ্রুপের চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন, যা মোয়াজ্জেম হোসেনের ভাবমূর্তিকেও ক্ষুণ্ন করছে।
চরলামছি গ্রামের বাসিন্দা শামসুদ্দীন বলেন, “সরকার আউটার বেড়িবাঁধ রক্ষায় জিও ব্যাগ ও বালু ফেলেছিল। এর আগেও এই বালু দস্যুদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কিন্তু কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পায় না। বালু কেটে নেওয়ায় বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাজারো বসতঘর, হাট-বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
ফেনী পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “বালু লুটের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে জড়িতদের বিরুদ্ধে আবারও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মারজান হোসাইন বলেন, “ঘটনাস্থল আমরা পরিদর্শন করেছি। বেড়িবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পুনরায় বালু ভরাট করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ফেনী পাউবো সহকারী পরিচালক মো. আরিফুর রহমান বলেন, “প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২৪ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বেড়িবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পূর্বের ন্যায় বালু দিয়ে ভরাট করতে হবে। অন্যথায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উল্লেখ্য, শনিবার (১ আগস্ট) দৈনিক খোলা কাগজে ‘সোনাগাজীতে মামলায়ও থামানো যাচ্ছে না বালু দস্যুদের, আবারও বেড়িবাঁধের বালু লুট’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে সরকারি অর্থায়নে বেড়িবাঁধ রক্ষায় ফেলা বালু রাতের আঁধারে কেটে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং এলাকাবাসীর উদ্বেগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সংবাদ প্রকাশের পরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়।
কেকে/এমএ