তীব্র গরমের মধ্যে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলায় ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন মানুষ। দিনের পাশাপাশি রাতেও দফায় দফায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কোনো কোনো এলাকায় একটানা এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ এলেও কিছুক্ষণ পর আবার চলে যাচ্ছে।
এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, শিশু, রোগী, কৃষক, ভ্যানচালক, ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজ। বিশেষ করে রাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাভাবিক ঘুমও হচ্ছে না অনেকের।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীরা। চিকিৎসাধীন রোগীদের পাশাপাশি চিকিৎসকরাও পড়ছেন চরম বিপাকে।
ক্ষেতলাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আতিকুর রহমান বলেন, “দিনে-রাতে দফায় দফায়, কখনো তিন-চারবার বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে পুরো চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ভ্যাপসা গরমে রোগীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্যানসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
তিনি আরও বলেন, কয়েকবার অপারেশন চলাকালীন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেছে। এতে রোগীদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অপারেশন কিংবা জরুরি চিকিৎসার সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল রাখার জন্য পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে অনুরোধ করা হলেও সিডিউলবিহীন আকস্মিক লোডশেডিংয়ের কারণে চিকিৎসকদের উৎকণ্ঠার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা চলায় লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিও বেড়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল হোসেন বলেন, “বর্তমানে আমার ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে রাতের লোডশেডিং পড়াশোনার সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাতে যে সময়টাতে নিবিড়ভাবে পড়াশোনা করি, ঠিক তখনই ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যায়। তীব্র গরম ও অন্ধকারে পড়ার টেবিলে বসা যায় না। আবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার কারণে রাতে ঠিকমতো ঘুমও হয় না। ফলে দিনের বেলায় ঘুম ঘুম ভাব থাকে, পরীক্ষায় মনোযোগ দিতে পারি না। এমনকি পরীক্ষা চলাকালীনও বিদ্যুৎ চলে যায়।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বলেন, “ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শিশুদের অস্বস্তি চরমে উঠেছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। তখন শিশুরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে চায় না, ছুটাছুটি করে। ভ্যাপসা গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে।”
দিনভর রোদে ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন ক্ষেতলাল পৌর এলাকার সূর্যবান গ্রামের মনোয়ার মোল্লা। তিনি বলেন, “সারাদিন ভ্যান চালিয়ে শরীর ক্লান্ত হয়ে যায়। বাড়িতে ফিরে একটু বিশ্রাম নিতে চাই। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে ঘুমানো যায় না। এতে পরের দিন কাজ করতেও কষ্ট হয়। সময়মতো ভ্যানে পর্যাপ্ত চার্জ দিতে না পারায় পরিবারের চাহিদা মেটাতেও সমস্যা হচ্ছে।”
বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরাও। ক্ষেতলাল পৌর এলাকার খুঞ্জিয়াপাড়া গ্রামের কৃষক মো. মতিয়র রহমান বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। খামারের গরু-ছাগল ফ্যানের অভাবে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে। বাড়ির বৃদ্ধ মানুষ ও শিশুরাও কষ্ট পাচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিকাজেও এর প্রভাব পড়ছে।”
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উপজেলার হিমাগারগুলোতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। হিমাগারের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারায় সংরক্ষিত পণ্যের গুণমান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উপজেলার পল্লী হিমাগারের ব্যবস্থাপক ছাব্বির আহমেদ বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকায় হিমাগারের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে, যা সংরক্ষিত পণ্যের গুণমানের জন্য ক্ষতিকর। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, এতে খরচও প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে।”
ক্ষেতলাল বিদ্যুৎ অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ডিপ টিউবওয়েলসহ সেচের বৈদ্যুতিক মোটর চালু থাকলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৫ থেকে ১৬ মেগাওয়াটে পৌঁছে। তবে ডিপ টিউবওয়েল চালু না থাকলে বর্তমানে চাহিদা প্রায় ১৩ মেগাওয়াট।
দিনের বেলায় পরিস্থিতি মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও রাতে বিদ্যুৎ সরবরাহে সংকট বেশি দেখা দেয়। এ সময় কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাত্র ৬ থেকে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় রাতে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যায়। বর্তমানে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৪০ শতাংশ লোডশেডিং থাকছে, যা কখনো কখনো ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
উপজেলায় ইটাখোলা, ক্ষেতলাল থানা বাজার ও গণমঙ্গল বাজার—এই তিনটি উপকেন্দ্রের আওতায় মোট ১১টি ফিডার রয়েছে। এসব ফিডারের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার গ্রাহককে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
ক্ষেতলাল বিদ্যুৎ অফিসের এজিএম কাজী তৌকির আহম্মেদ বলেন, “আমরা চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ পাই। বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়টি আমাদের হাতে নেই। আমরা মূলত একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করি। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যায়, সেটিই পুরো উপজেলায় বণ্টন করা হয়।”
তিনি বলেন, “বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ সময়ভেদে ওঠানামা করে। বিশেষ করে রাতে সরবরাহ কমে গেলে লোডশেডিং বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে স্থানীয়ভাবে লোডশেডিং করার কোনো সুযোগ বা নিয়ন্ত্রণ নেই। বরাদ্দ অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বণ্টন করাই তাদের কাজ।”
জয়পুরহাট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর পরিচালক মাহমুদুল হাসান চৌধুরী রকেট বলেন, “বর্তমানে যে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে, তা কোনো স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি জাতীয় ও সমসাময়িক সমস্যা। মূলত জাতীয় গ্রিডের সমস্যার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের উৎপাদন বা প্রাপ্তি কম থাকায় যতটুকু বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তা সামঞ্জস্য করে বা ভাগাভাগি করে বিতরণ করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং তা নিরসনের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ সমস্যার সমাধান হবে।”
এদিকে তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা কমিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, রোগী, কৃষক, শ্রমজীবী ও ব্যবসায়ীদের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কেকে/সাশ