পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ কয়েক দিন আগে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তিস্তা নদীর ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করলেও রক্ষা করা গেল না ‘ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় বিদ্যালয়টির আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যালয়টি রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শনের পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশায় ছিলেন স্থানীয়রা। তবে সেই আশার প্রতিফলন না ঘটায় এখন বিদ্যালয়টি নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়রা জানান, বিদ্যালয়টি কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনে আশপাশের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয়রা।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ইউপি চেয়ারম্যান, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত বিদ্যালয়টি রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
সর্বশেষ গত ৮ আগস্ট পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। এতে বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আশায় ছিলেন স্থানীয়রা। কিন্তু সেই আশাও শেষ পর্যন্ত হতাশায় পরিণত হয়েছে। তিস্তার ভাঙন থেকে বিদ্যালয়টি রক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় এখন এর আসবাবপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিন বলেন, “টিইও, এটিও, ইউএনও, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ডিসিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। নতুন করে যেন আর কোনো ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তারা। বিশেষ করে চরবাসীর একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ পর্যন্ত বিদ্যালয়টি রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিদ্যালয়টি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে আজ এই করুণ দৃশ্য দেখতে হতো না। এর দায় সংশ্লিষ্ট কেউই এড়াতে পারবেন না।”
বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “গতকালও স্কুলে ক্লাস হয়েছে। ভোরে স্কুলের এই অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে এটিও স্যারকে জানাই। তিনি ঘটনাস্থলে এসেছেন। পরে পরামর্শ করে ১৪ জন শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা বিদ্যালয়ের জিনিসপত্র নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন। এর মধ্যেই একটি বেড়া ও তিনটি জানালা নদীতে চলে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “মন্ত্রী, এমপি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ডিসি ও ইউএনও স্যার সবাই এসেছিলেন। শুধু আশ্বাস পেয়েছি। স্কুলের এলাকায় একটি জিও ব্যাগও ফেলেননি তারা। জিও ব্যাগ ফেললে হয়তো আজকের এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে হতো না।”
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুকুল চন্দ্র বর্মণ ঘটনাস্থল থেকে বলেন, “নদীভাঙন শুরুর পর থেকে যখন যা ঘটেছে, বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জানানো হয়েছে। তারা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। সে কারণে আজ এই ভয়াবহ অবস্থা।”
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, “নতুন করে আবারও ভাঙন শুরু হয়েছে। বিষয়টি শুনেছি। প্রতিষ্ঠানটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
নদীভাঙন ঠেকাতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কোনো গাফিলতি আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, “নদীভাঙনের বিষয়ে কারও কোনো হাত নেই। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো গাফিলতি আছে কি না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।”
গাইবান্ধা জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “খবর পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আশা করি কিছুক্ষণের মধ্যে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হবে।”
তিনি আরও বলেন, “স্কুল এলাকায় কোনো জিও ব্যাগ ফেলা হয়নি, এটা ঠিক। তবে গত বছর ওই স্কুলের আপ ও ডাউনে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল। এবার ওই স্কুল রক্ষায় কোনো জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।”
এ বিষয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে বিদ্যালয়টি রক্ষা করা সম্ভব হতো। এখন নদীভাঙনের মুখে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হারানোর পাশাপাশি চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
কেকে/সাশ