সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর পাশাপাশি ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন স্থগিত চেয়ে করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এএফএম সাইফুল করিমের বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
আদেশে আদালত বলেছে, ‘রিট আবেদনে কোনো সারবত্তা নেই। এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিষয়ে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে যে, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের।’
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তার সাথে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মামুন চৌধুরী ও আখতার হোসেন মো. আব্দুল ওয়াহাব।
অন্যদিকে রিটকারী আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ নিজেই নিজের পক্ষে শুনানি করেন।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে রিট আবেদনটি করেন।
রিট আবেদনে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কেন সংবিধানের সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ৬ আগস্টের তফসিল কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না— তা জানতে রুল চাওয়া হয়েছিল। একইসঙ্গে রুল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় ওই তফসিলের কার্যক্রম স্থগিত চাওয়া হয়।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল সাংবাদিকদের কাছে শুনানিতে তুলে ধরা রাষ্ট্রপক্ষের আইনি যুক্তি ও আদালতের আদেশের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘রিট আবেদনকারীর বক্তব্য ছিল, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে কোনো সংসদ সদস্য পার্লামেন্টের কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বা ভোট দিতে পারেন না এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। পাশাপাশি তিনি দ্রুততার সঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিকেও চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।’
এর উত্তরে রাষ্ট্রপক্ষের দেওয়া আইনি যুক্তি তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে থাকা ৭০ অনুচ্ছেদ এখনও একইভাবে আছে।’
তার ভাষ্য, নব্বইয়ের গণআন্দোলনের পর যখন প্রেসিডেনশিয়াল ফর্ম থেকে সরকার ব্যবস্থা পার্লামেন্টারি ফর্মে আসে, তখন সংবিধানের ১২তম সংশোধনী গণভোটে যায়। সেই গণভোটে ৭০ অনুচ্ছেদটিও কিছুটা সংশোধিত আকারে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে অনুমোদিত হয়। পরে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২ সালের মূল অনুচ্ছেদটিই প্রতিস্থাপিত হয়।
রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ‘যে সংশোধনীর ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণ গণভোটের মাধ্যমে রায় দিয়েছে এবং যা গত ৫৪ বছর ধরে সংবিধানে একইরকমভাবে আছে, সেটি নির্বাচনকে সামনে রেখে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’
আদালতে নজির হিসেবে ১৯৯১ সালের একটি রায়ের কথা তুলে ধরেন তিনি। ওই সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন হাই কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হলেও আদালত রায়ে জানিয়েছিল, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদটি সংবিধানের সঙ্গে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়।
দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে তিনি আদালতকে বলেন, ‘সংবিধানের ৫০ ও ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে নির্বাচন আয়োজনের একটি সর্বোচ্চ সময়সীমা দেওয়া আছে, কিন্তু এর আগেই নির্বাচন করা যাবে না— এমন কোনো কথা নেই।’
রুহুল কুদ্দুস কাজল আরও বলেন, ‘পার্লামেন্ট মনে করেছে, পদটি দ্রুত পূরণ করা দরকার, সে কারণেই অধিবেশন ডেকে সাংবিধানিক নিয়মেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে রিটকারীর সংক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ নেই।’
একই বিষয়ে রিট আবেদনকারীর আগের মামলার কথা তুলে ধরে অ্যাটর্নি জেলারেল বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই একই আইনজীবী ২০১৭ সালেও ৭০ অনুচ্ছেদ চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করেছিলেন। সে সময় হাই কোর্টের দ্বৈত বেঞ্চে বিভক্ত আদেশ আসার পর ২০১৮ সালে তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি এ টি এম সাইফুর রহমান রিটটি সরাসরি খারিজ করে দেন এবং জানান, এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। ওই আদেশের পর রিটকারী আপিল বিভাগে যাননি।"
এবার আপিল করবেন কিনা, সেই প্রশ্নে রিট আবেদনকারী ইউনুস আলী আকন্দ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখনো ঠিক করিনি।’
বলে রাখা ভালো, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য গেল ৬ আগস্ট তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুযায়ী, আগামী বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) এ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা রয়েছে। আজ মঙ্গলবার ছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহরের শেষ দিন। তবে দুই প্রার্থী বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের অলি আহমেদ কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।
কেকে/এমএ