মরুভূমির প্রাণী দুম্বা এখন আর শুধু মরু অঞ্চলের দৃশ্য নয়। নাটোরের সবুজ-শ্যামল পরিবেশেও বাণিজ্যিকভাবে পালন হচ্ছে এই প্রাণী। জেলার খামার পাথুরিয়া গ্রামে ৩২ বিঘা জমির ওপর গড়ে ওঠা ‘ভাই ভাই ছাগল ও দুম্বা খামার’ ইতোমধ্যে দুম্বা পালনের জন্য পরিচিতি পেয়েছে। দুম্বার পাশাপাশি এখানে পালন করা হচ্ছে বিভিন্ন জাতের ছাগল, গরু ও গাড়ল।
সরেজমিনে দেখা যায়, বড় একটি পুকুরের পাড় ঘেঁষে ছায়াঘেরা পরিবেশে গড়ে উঠেছে খামারটি। এখানে ১৪ প্রজাতির প্রায় ৩০০ ছাগল রয়েছে। রয়েছে গাড়ল ও বিভিন্ন জাতের গরুও। তবে খামারের প্রধান আকর্ষণ মরুর প্রাণী দুম্বা। বর্তমানে টার্কি, আওয়াসি ও নাগরি জাতের ৭৫টি দুম্বা রয়েছে খামারটিতে।
খামারি সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে ভারত থেকে দুই জোড়া দুম্বা সংগ্রহের মাধ্যমে খামারে এ প্রাণী পালন শুরু হয়। হান্নান সরকার, আনোয়ার হোসেন ও ফেরদৌস আহমেদ—তিন ভাই মিলে ধীরে ধীরে দুম্বার সংখ্যা বাড়াতে থাকেন। বর্তমানে তাদের খামারে দুম্বার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের গবাদিপশুর বড় সংগ্রহ রয়েছে।
খামারিরা জানান, গত কোরবানির ঈদে তাদের খামার থেকে প্রায় ২০০টি দুম্বা বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি দুম্বার ওজন প্রায় দেড় মণ থেকে চার মণ পর্যন্ত। আকার ও ওজনভেদে একেকটির দাম ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত।
তাদের দাবি, অন্যান্য অনেক গবাদিপশুর তুলনায় দুম্বার রোগবালাই কম। খাবারের খরচও তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি পালন করে ভালো লাভ করা সম্ভব। দেশের আবহাওয়ার সঙ্গেও প্রাণীটি ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে দুম্বা পালনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন খামারিরা।
খামারি হান্নান সরকার বলেন, “ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর দুই-তিনটি ছাগল পালন দিয়ে তাদের পশুপালনের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে গাড়ল পালন এবং পরে গরু-ছাগলের খামার গড়ে তোলেন তারা। পরিচিত ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় ভারত থেকে তিনটি মাদি ও একটি পুরুষ দুম্বা সংগ্রহের পর শুরু হয় দুম্বা পালন। সেই চারটি দুম্বা থেকেই বর্তমানে খামারে সংখ্যা বেড়েছে।”
খামারি ফেরদৌস আহমেদ বলেন, “প্রথমদিকে দুম্বার তেমন চাহিদা ছিল না। সময়ের সঙ্গে মানুষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বিশেষ করে কোরবানির সময় এর চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ কোরবানির জন্য দুম্বা কিনতে আসেন। আবার অনেকে শুধু প্রাণীটি দেখার জন্যও খামারে ছুটে আসেন।”
খামারি আনোয়ার হোসেন বলেন, “তাদের খামারে দুম্বা পালনে সাফল্য দেখে অনেকেই আগ্রহী হয়েছেন। কেউ কেউ এখান থেকে দুম্বা নিয়ে ছোট পরিসরে খামার করার পরিকল্পনাও করছেন। এ খাতকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।”
খামারের কার্যক্রম পরিচালনায় বর্তমানে ২৩ জন শ্রমিক কাজ করছেন। পশুগুলোকে সুস্থ ও রোগমুক্ত রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। খামারের সব প্রাণীকে দেশীয় ও প্রাকৃতিক খাদ্য দেওয়া হয়। প্রতিদিন দুই বেলা খড় ও ভূষি এবং দুপুরে তাজা ঘাস খাওয়ানো হয়। পশুর খাদ্যের চাহিদা পূরণে খামারের সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে উন্নত জাতের ঘাস চাষ করা হয়েছে।
খামারের শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, “প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি এখানে কাজ করছেন। এখানে কাজ শুরু করার আগে কখনো দুম্বা দেখেননি। এখন নিজ হাতে এসব প্রাণীর পরিচর্যা করতে ভালো লাগে। কোরবানির মৌসুমে ক্রেতা ও দর্শনার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কাজের ব্যস্ততাও বেড়েছে।”
নাটোর সদর উপজেলার তেবাড়িয়া থেকে দুম্বা দেখতে আসা দর্শনার্থী দিপু বলেন, “এতদিন দুম্বাকে শুধু ভিডিওতে দেখেছেন। এবার সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। নাটোরের মাটিতে দুম্বা পালন হচ্ছে দেখে তিনি আনন্দিত। তার মতে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর উদ্যোগ নিলে দেশে দুম্বা পালন আরও বিস্তৃত হতে পারে।”
বড়াইগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, দুম্বার খামারটি অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার। এটি দেখে স্থানীয় অনেকেই দুম্বা পালনে আগ্রহী হচ্ছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশের আবহাওয়া দুম্বা পালনের জন্য উপযোগী হওয়ায় দেশে বাণিজ্যিকভাবে এ প্রাণী পালনের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং আধুনিক পদ্ধতিতে দুম্বা পালনের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে পারলে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।”
কেকে/সাশ