বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মো. সাইফুল ইসলাম (৩২) নামে এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হয়েছেন।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে উপজেলা ব্যাটালিয়নের (১১ বিজিবি) অধীন টার্গুপাড়া বিওপির দায়িত্বপূর্ণ সীমান্ত পিলার-৫২ সংলগ্ন মিয়ানমারের অভ্যন্তরে এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
নিহত সাইফুল ইসলাম উপজেলার দৌছড়ি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পাইনছড়ি এলাকার বাসিন্দা মো. সাবেরের ছেলে।
জানা যায়, সীমান্ত পিলার-৫২ থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার শূন্যরেখার আনুমানিক ৩০০-৪০০ মিটার মিয়ানমারের অভ্যন্তরে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন ডুইল্যাঝিরি ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণ ঘটে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ওই এলাকায় বাঁশ কাটতে গেলে সাইফুলের পা পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইনের ওপর পড়লে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তার দুই পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরে স্থানীয়রা গুরুতর আহত সাইফুলকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। অবস্থার অবনতি হলে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার দুপুরে তার মৃত্যু হয়।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘সীমান্তের মিয়ানমার অংশে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে এক বাংলাদেশি যুবক গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইসমাত জাহান ইতু বলেন, ‘সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয়দের অপ্রয়োজনে যাতায়াত না করার জন্য সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বাঁশ, কাঠ বা অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ না করতে স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।’
বিজিবি সূত্রে জানা যায়, ‘সীমান্তের ওপারে সংঘাতের কারণে মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় স্থলমাইন পুঁতে রাখা হয়েছে। ফলে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশি নাগরিকদের মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘটনাস্থলকে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।’
এদিকে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে সাইফুলের মৃত্যুর ঘটনায় সীমান্তবর্তী এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সীমান্তের ওপারে বিভিন্ন স্থানে ল্যান্ডমাইন থাকার কারণে গবাদিপশু চরানো, বাঁশ-কাঠ সংগ্রহসহ জীবিকার প্রয়োজনে চলাচলকারী মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সীমান্তসংলগ্ন দুর্গম এলাকার অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জীবিকার প্রয়োজনে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে পাহাড়ি এলাকা থেকে বাঁশ ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে আসছেন। কিন্তু সেখানে চলমান সংঘাত ও ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখার কারণে এ ধরনের যাতায়াত এখন প্রাণঘাতী ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়রা বলেন, ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে এর আগেও সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ সাইফুলের মৃত্যুর ঘটনা সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষ যাতে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর আরও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সীমান্তের ওপারে পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন অপসারণ বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তাই সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাদের চলাচল বন্ধে কার্যকর নজরদারি জোরদার করাই আপাতত সবচেয়ে জরুরি।
সাইফুলের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সীমান্তের ওপারে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের প্রাণহানির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
কেকে/এআই