ভারতের নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (ফসিসি) বাংলাদেশের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকে নিয়ে সেমিনার আয়োজন করেছিল। পরে দিল্লি পুলিশের বাধার কারণে শেষ পর্যন্ত সেমিনারটি বাতিল করেন আয়োজকরা। শনিবার (২৯ আগস্ট) সন্ধ্যায় সেমিনারটি হওয়ার কথা ছিল।
শনিবার সন্ধ্যায় এফসিসি বিবৃতিতে জানায়, দিল্লি পুলিশ শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানটির অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণেই সেমিনারটি বাতিল করতে হয়েছে।
সেমিনার আয়োজনের বিষয়টি নিয়ে এফসিসির পক্ষ থেকে আগেই তাদের এক্স অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দিয়েছিল। সেখানে বিষয়বস্তু ও কারা বক্তব্য দিবে সেই বিষয়গুলো লিফলেটও যুক্ত ছিল। সেমিনারে অন্য বক্তাদের মধ্যে উপস্থিত থাকার কথা ছিল আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদের। এছাড়া মানবাধিকারকর্মী, গবেষক, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রিসহ বেশ কয়েকজন এই সেমিনারে বক্তা হিসেবে ছিলেন।
ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ নন্দ বলেন, ‘তারা শুধু আমাদের বলেছে এই অনুষ্ঠান করার অনুমতি নেই। তবে ঠিক কি কারণে অনুমতি নেই বা তারা বন্ধ করেছে কেন সেটি তারা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’
এ নিয়ে দিল্লি পুলিশ আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি। দিল্লি পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা থাকলে পুলিশ যে কোনো সময়ে যে কোনো অনুষ্ঠান বাতিল করার অধিকার রাখে।’
এ নিয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর পূর্বে, গেল ৫ আগস্ট দিল্লিতে আরও একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিল এফসিসি। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেন। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল ঢাকা। এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়।
এ বছরের ৫ আগস্টের অভিজ্ঞতা পর হয়তো দিল্লি আওয়ামী লীগ নেতাদের কোন প্রকাশ্যে অনুষ্ঠান করতে দিতে চাইছে না বলেই মনে করা হচ্ছে।
প্রায় একই রকম বলছেন বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিকরা। তারা মনে করেন, শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের পরই দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ককে আরও তিক্ত করেছিল। যে কারণে প্রায় একই ধরনের আরেকটি অনুষ্ঠান হোক সেটি দিল্লি চায়নি।
দিল্লির অনুষ্ঠান নিয়ে কী জানা যাচ্ছে :
দিল্লিতে যে সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল তার বিষয় ছিল ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া : ফ্রম ডায়ালগ টু এ পার্টনারশিপ’।
এফসিসি মূলত দিল্লিতে বিদেশি গণমাধ্যমের সংবাদকর্মীদের একটি সংগঠন। গত ২৭ আগস্ট ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের এক্স অ্যাকাউন্টে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টে জানানো হয়, এফসিসির পাশাপাশি এই সেমিনারটির যৌথ আয়োজক হিসেবে রয়েছে বেলজিয়ামভিত্তিক ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’ নামে সংগঠন।
এফসিসির ঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল নয়াদিল্লির স্যার মার্ক টালি অডিটোরিয়ামে।
সেমিনারের জন্য এফসিসি যে অনলাইন প্রচারপত্র তৈরি করে এক্স অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা হয়েছিল, সেখানে প্যানেল বক্তাদের তালিকায় আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ, বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী ও মানবাধিকার কর্মী নূরান নবী, রোহিঙ্গা অধিকার কর্মী ও রোহিঙ্গা ইউনাইটেড ইয়ুথ নেটওয়ার্কের সভাপতি রবি আলম, ইউনাইটেড ডিপ্লোম্যাটিক কাউন্সিলের সভাপতি আসিফ ইকবাল।
এছাড়া সেমিনারের আলোচক হিসেবে নাম ছিল বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি, ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক জার্মান রাষ্ট্রদূত পিটার ফারেনহোল্টজ, চেক রাজনীতিবিদ ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ওন্দ্রেজ দোস্তাল ও এফসিসি-আইএপিসি গ্লোবাল ফোরামের চেয়ারম্যান ভেঙ্কট নারায়ণ।
কেন বাতিল হলো অনুষ্ঠান :
গত বৃহস্পতিবার এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে আগেই ঘোষণা দিয়েছিল ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’। এরপর অনুষ্ঠান শুরুর কিছু আগে শনিবার দুপুরে এফসিসি সাউথ এশিয়ার এক্স অ্যাকাউন্টের একটি পোস্টে সংগঠনটি জানায়, দিল্লি পুলিশ আজ সন্ধ্যায় ইউরোপ ও এশিয়া বিষয়ক এফসিসির অনুষ্ঠান আয়োজন বন্ধ করে দিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘এই আকস্মিক পরিস্থিতি যে আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন।’
সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, এতে যে অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে, তার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং বিষয়টি আপনারা যে বুঝতে পারছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞ।
তবে, এই অনুষ্ঠানটি যে দিল্লির পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে সেটি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হলেও কেন তা করা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানানো হয়নি।
দিল্লি পুলিশ রাজ্য সরকারের অধীনস্থ কোনো বাহিনী নয়। এটা পরিচালিত হয় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে।
ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ নন্দ বলেন, ‘তারা ঠিক কী কারণে এই অনুষ্ঠান বন্ধ করলো সেটি আমাদের বলেনি। আমরা বার বার তাদের কাছে কারণ জানতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা কারণ জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।’
‘তারা শুধু বন্ধ করেনি, সন্ধ্যার দিকে পুলিশ সেখানে ব্যারিকেড দিয়েছে। সেখানে ১০০’রও বেশি পুলিশ মোতায়েন করেছে।’
বিষয়টি নিয়ে দিল্লি পুলিশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা থাকলে পুলিশ যে কোনো সময়ে যেকোনো অনুষ্ঠান বাতিল করার অধিকার রাখে।’
তবে শনিবার সন্ধ্যার অনুষ্ঠানটি নিয়ে তেমন কোন আশঙ্কা ছিল কি না কিংবা সে কারণেই অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়েছে কি না সে সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি ওই কর্মকর্তা।
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঠিক তার দুই বছর পর এই এফসিসির একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা। ওই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ঢাকা।
বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিক ও বিশ্লেষক মাহফুজুর রহমান মনে করেন, শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যে বক্তব্য রেখেছিল সেটি দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ককে আরও তিক্ত করেছে। যে কারণে প্রায় একই রকম আরেকটি অনুষ্ঠান হোক তা দিল্লি চায়নি।
তিনি বলেন, ‘এটি একটা পজেটিভ সিগনাল। বাংলাদেশের কনসার্নকে তারা ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। যে কারণে ভারত তাদের দিক থেকে আর কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি।’
সূত্র : বিবিসি বাংলা
কেকে/এমএ