ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।
আজ সোমবার (৩১ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ মো. শাহজাহান কবির এ আদেশ দেন।
দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় ফয়সাল ও তার স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার বিষয়ে এ আদেশ দেওয়া হয়।
ফয়সাল করিম মাসুদ বর্তমানে ভারতের কারাগারে আটক। এর মধ্যেই তার ও স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে দুইজনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেওয়া হয়।
দুদকের উপপরিচালক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর পূর্বে দুদকের সহকারী পরিচালক সাইফুর রহমান ফয়সাল ও তার স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আদালতে আবেদন করেন।
আবেদনে বলা হয়, ‘ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১২৭ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অর্থের উৎস এবং লেনদেনের সঙ্গে দুর্নীতি বা মানি লন্ডারিংয়ের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধান করছে দুদক।’
আবেদনে আরও বলা হয়, ‘অনুসন্ধান চলাকালে অভিযুক্তরা যে কোনো সময় বিদেশে চলে যেতে পারেন। তারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে দুজনের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন।’
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল করিম বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে ভারতে যান বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য উঠে আসে। পরে গত ৮ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) তাকে উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তার সঙ্গে আলমগীর হোসেন নামের আরেকজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর থেকে ফয়সাল ভারতের বিচারিক হেফাজতে রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের একটি আদালতেও তাকে হাজির করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফয়সাল ও তার সহযোগীকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দুদেশের মধ্যে প্রক্রিয়া এগোনোর কথাও এর আগে জানানো হয়েছিল।
অর্থাৎ, ফয়সাল বর্তমানে ভারতের কারাগারে থাকলেও বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলার পাশাপাশি দুদকের আর্থিক অনুসন্ধানও চলছে। আজকের আদেশটি মূলত দেশে থাকা তার স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার বিদেশযাত্রা ঠেকানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
মামলার তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে ব্যাটারিচালিত রিকশায় থাকা শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে ১৮ ডিসেম্বর রাতে তার মৃত্যু হয়।
হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় মামলা করেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। পরে তার মৃত্যুর পর মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
তদন্ত শেষে গত ৬ জানুয়ারি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল ওরফে দাউদসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।
এ মামলায় ফয়সালকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর তার ভারতে পালিয়ে যাওয়া এবং পরে সেখানে গ্রেপ্তার হওয়ার বিষয়টি মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
হাদি হত্যা মামলার বাইরে এবার ফয়সাল ও তার স্ত্রীর আর্থিক লেনদেন নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তাদের ব্যাংক হিসাব ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে প্রায় ১২৭ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়ার কথা আদালতে জানিয়েছে সংস্থাটি।
এই অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে লেনদেন হয়েছে এবং এর সঙ্গে দুর্নীতি বা মানি লন্ডারিংয়ের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে দুদক।
অনুসন্ধান চলাকালে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখিয়ে দুদক তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আজ আদালত ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়ার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর আদালতের এক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ফয়সাল বর্তমানে ভারতের কারাগারে থাকায় তার ক্ষেত্রে আদেশটি তাৎক্ষণিকভাবে বিদেশযাত্রা ঠেকানোর চেয়ে বাংলাদেশে চলমান আইনি ও অনুসন্ধান কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কার্যকর হয়েছে। আর তার স্ত্রী শাহেদা পারভীনের ক্ষেত্রে দেশত্যাগ ঠেকানোর বিষয়টি সরাসরি প্রযোজ্য।’
কেকে/এমএ