নেই কোনো ভূমি, নেই কোনো বাসস্থান। দিন কাটছে ভাড়া বাসায়। তবুও ভূমিসংক্রান্ত নানা জটিলতা নিয়ে চিন্তামগ্ন সেলিম মিয়া। তার ভাবনা কেন বাড়ছে জমিজমা নিয়ে খুনখারাবী ও মারামারি? নারীরা কেন বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের অধিকার থেকে? ভূমি সংক্রান্ত এসব নানা জটিলতা দূর করতে বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন দৈনিকে উঠে আসা হাজার হাজার খবর সংগ্রহ করে সেঁটে দিয়েছেন ঘরের চার দেয়াল জুড়ে। নাম দিয়েছেন ‘ভূমি গবেষণাগার ও তথ্য ভাণ্ডার’। তার উদ্ভাবিত ‘ডিজিটাল ভূমি কার্ড’ চালু হলে অবসান হবে ‘জোর যার, মুলুক তার’ নীতি।
জানা যায়, উচ্চমাধ্যমিক পাস করা সেলিম মিয়ার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পার্শ্ববর্তী কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের চর বিরহিমের সাতালস্কর গ্রামে। তিনি ১৯৯৫ সালে তিস্তার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে বসবাস শুরু করেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরের ভাড়া বাসায়। জীবিকার তাগিদে এনজিওতে বছর খানেক চাকরি করার পর বন্ধ হয়ে যায় সেটিও। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুরু করেন মামলার এজাহার লেখালেখির কাজ। আর এজাহার লিখতে গিয়ে তিনি দেখেন, অধিকাংশ মামলাই ভূমি সংক্রান্ত। চিন্তায় পড়েন সেলিম। সবকিছুকে পিছনে ফেলে শুরু করেন ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা থেকে মুক্তির উপায়। গড়ে তোলেন তার ‘ভূমি গবেষণাগার’।
সেলিমের গবেষণাগারে দেখা যায়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত ভূমি নিয়ে সংঘটিত বিভিন্ন সংঘর্ষে নিহত, আহত, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাবলি নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর সংগ্রহ করে ঘরের চার দেয়ালে আটা দিয়ে সেঁটে রেখেছেন। এ ছাড়া ষ্ট্যাম্প খরচের হিসাব, ভূমি জরিপের ভুল-ত্রুটি, জালদলিল তৈরির কারখানা, ভূমি জবরদখল ও ভূমিদস্যুতা, অফিসে ছেঁড়া ফাটা গায়েব, সাবেক ছিটমহলে ভূমি সমস্যা, রেলওয়ের জমি জবরদখল, আদিবাসীদের ভূমি সমস্যা, ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যা, সাবরেজিট্রার অফিসে সমস্যা, সমাজের কুচক্রী মানুষ কর্তৃক বিভিন্ন জাল জালিয়াতির মতো বিষয়গুলোর হাজার হাজার পত্রিকা কাটিং সাঁটিয়েছেন স্বাধীন এ গবেষক।
হিসাব রেখেছেন, জানুয়ারি ২০১৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত দেশে ভূমি সংক্রান্ত বিষয়ে খুনের সংখ্যা। তার সংরক্ষিত হিসাব মতে, এই ১৩ বছরে দেশে মানুষ খুন হয়েছেন ২৪০২ জনের উর্ধ্বে।
এরমধ্যে রংপুর বিভাগে ৪৭৭ জন, রাজশাহী বিভাগে ৪৩৪ জন, খুলনা বিভাগে ২৩৪ জন, বরিশাল বিভাগে ১১৮ জন, ঢাকা বিভাগে ৪০৮ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১৭জন, সিলেট বিভাগে ১৮৬ জন ও চট্টগ্রাম বিভাগে ৩২৬ জন এবং আহত হয়েছেন কয়েক হাজার।
সেলিম মিয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রত্যেক ভূমি মালিকের জন্য থাকবে একটি ডিজিটাল কার্ড। সেখানে মালিকের মোট জমির পরিমাণ, মৃত্যুর তারিখ, ওয়ারিশদের তালিকাসহ জমির মালিকানা ও লেনদেনের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। কোনো জমি কেনা হলে কার্ডে জমির পরিমাণ যোগ হবে, বিক্রি হলে সেই পরিমাণ বিয়োগ হবে। ফলে একজন ব্যক্তির মোট জমির পরিমাণ ও মালিকানার পরিবর্তন সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে।
সেলিম মিয়ার ভাষ্য, সরকারিভাবে এ ডিজিটাল ভূমি কার্ডের ব্যবস্থা করা গেলে একজনের জমি আরেকজন জোর করে দখল করে রাখার সুযোগ কমে যাবে। ওয়ারিশদের মধ্যে কে কতটুকু জমির অধিকারী, সেটিও স্পষ্ট থাকবে। ফলে মানুষকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা কঠিন হবে।
তিনি মনে করেন, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমি নিয়ে বিরোধ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও সংঘর্ষ কমানো সম্ভব। তার ভাষায়, ‘জোর যার, মুলুক তার’ কিংবা ‘লাঠি যার, জমি তার’ এ মানসিকতার অবসান ঘটাতে হলে ভূমির মালিকানা ও লেনদেনের তথ্যকে সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে।
ভূমি নিয়ে বছরের পর বছর চলা বিরোধের তথ্য ঘরের দেয়ালে জমা করেছেন সেলিম। সেই দেয়ালজুড়ে এখন শুধু পুরোনো সংবাদ নয়, রয়েছে তার দীর্ঘদিনের প্রশ্ন, শ্রম, গবেষণা ও সমাধানের চেষ্টা। নিজের ভিটেমাটি হারানো এ মানুষটির স্বপ্ন, একদিন প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমির মালিকানা হবে আরও স্বচ্ছ, আর জমির জন্য কোনো পরিবারকে যেন আর স্বজনের রক্তে হাত রাঙাতে না হয়।
কেকে/এআই