মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● দীপু মনির ঘনিষ্ট সহচর মিনহাজ মান্নান ইমনের কবজায় ডিএসই      ● প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতিসংঘে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদলকে মন্ত্রিসভার অভিনন্দন      ● হাম উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩১০      ● ডেঙ্গুতে আরও আটজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ২০৩৬      ● সিঙ্গাপুরের কাছেও হারল বাংলাদেশ, বিদায়ের শঙ্কা      ● সাংবাদিক গ্রেপ্তারে আদালতের অনুমতির প্রস্তাব      ● প্রিজন ভ্যান থেকে ‘পিচ্চি রাজা’র পলায়ন, বরখাস্ত ৫ পুলিশ সদস্য      
দেশজুড়ে
মেলান্দহে বিএডিসির সার সিন্ডিকেট : ডিলারের নামে বরাদ্দ, যাচ্ছে উত্তরবঙ্গে
জামালপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৬ পিএম আপডেট: ০৮.০৯.২০২৬ ৮:৪৬ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

কৃষকের জমিতে যাওয়ার কথা সরকারি বরাদ্দের সার। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই সারই ডিলারের গুদামে পৌঁছানোর আগেই হাতবদল হচ্ছে। নিবন্ধিত ডিলারের প্যাড ব্যবহার করে মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউন থেকে সার উত্তোলন করার পর সেই সার চলে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। সেখানে কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। আর এ কারবার ঘিরে মেলান্দহে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সার কালোবাজারি সিন্ডিকেট।

অভিযোগ আরও গুরুতর— সার উত্তোলনের ক্ষেত্রেও দিতে হয় ‘অতিরিক্ত টাকা’। কোনো কোনো আমদানি করা সারের বস্তাপ্রতি ২০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২০ টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন ডিলাররা। টাকা না দিলে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও সার পেতে নানা অজুহাতে দিনের পর দিন ঘোরানো হয় বলেও তাদের অভিযোগ। অর্থাৎ, কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার উত্তোলনেও টাকা, আবার সেই সার হাতবদলেও টাকা— এভাবেই সরকারি সারকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ‘বরাদ্দ থেকে বাজার’ পর্যন্ত একটি অদৃশ্য বাণিজ্যপথ।

বরাদ্দ ১১৮২ টন টিএসপি, ডিএপি ২১১১ টন
 
কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে জামালপুরের ২৬৪ ডিলারের জন্য মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউন থেকে ১ হাজার ১৮২ মেট্রিক টন বিএডিসি টিএসপি এবং ২ হাজার ১১১ মেট্রিক টন ডিএপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আমদানি করা ডিএপি ১ হাজার ৭৩৫, বাংলা ডিএপি ২৩৮ এবং বিএডিসি ডিএপি ১৩৮ মেট্রিক টন। এ ছাড়া বিএডিসি এমওপি বরাদ্দ রয়েছে ১ হাজার ৭৭২ মেট্রিক টন।

জেলায় এত বিপুল পরিমাণ সার বরাদ্দ থাকলেও কৃষকের কাছে তা যথাসময়ে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরাদ্দের সার উত্তোলন ও পরিবহন ব্যবস্থার ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় রয়েছে একটি চক্র।

এক গাড়িতে কয়েক ডিলারের সার
 
মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউন থেকে জামালপুর সদরের ৬৫, সরিষাবাড়ীর ৫২, মেলান্দহের ৪৫, ইসলামপুরের ২৫, মাদারগঞ্জের ২৬, বকশিগঞ্জের ২৪ এবং দেওয়ানগঞ্জের ২৭ জন ডিলার সার উত্তোলন করেন। 

ডিলারদের অভিযোগ, একজনের নামে ২০–৩০ বা তার কমবেশি বস্তা সার বরাদ্দ হওয়া এবং গাড়ির সংকটকে কাজে লাগানো হচ্ছে। তিন থেকে পাঁচজন ডিলারের বরাদ্দ এক গাড়িতে উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে কোন ডিলারের কত সার কোথায় যাচ্ছে, তার হিসাব গরমিলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগেই ডিলারের প্যাড সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট চক্র সার উত্তোলন করছে। এরপর জেলার কৃষকের পরিবর্তে সার যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বাজারে।

সার না দিলে পরের মাসের বরাদ্দে সমস্যা
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ডিলার বলেন, মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউনকেন্দ্রিক একটি চক্রের কাছে সার বিক্রি না করলে পরের মাসের বরাদ্দ পেতে সমস্যায় পড়তে হয়। ফলে অনেকেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও চক্রটির সঙ্গে সমঝোতা করেন।

এক ডিলার বলেন, ‘বরাদ্দ আমাদের নামে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে।’

আরেক ডিলার বলেন, ‘সার নিতে গেলে একদিকে টাকা দিতে হয়, অন্যদিকে নির্দিষ্ট লোকের সঙ্গে সমঝোতা না করলে সার পেতে ভোগান্তি হয়। প্রতিবাদ করলে পরের মাসের বরাদ্দ নিয়ে ভয় থাকে।’

গোডাউনে প্রকাশ্য দর-কষাকষি
 
সম্প্রতি সরেজমিনে মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউনে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচটি নছিমনে সার লোড করা হচ্ছে। সেখানে ডিলার প্রতিনিধি ও ক্যাটিম্যানের মধ্যে টাকা নিয়ে দর-কষাকষি হয়। পরে গাড়িপ্রতি ১৫০ টাকা দেওয়ার পর পাঁচটি গাড়িতে সার লোড করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এর আগে সার ডেলিভারি নেওয়ার ক্ষেত্রেও বস্তাপ্রতি আলাদা টাকা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন ডিলার।

তাদের অভিযোগ, মরক্কো থেকে আমদানি করা টিএসপি, সৌদি আরব থেকে আমদানি করা ডিএপি এবং রাশিয়া থেকে আমদানি করা এমওপি বস্তাপ্রতি ২০ টাকা এবং তিউনিসিয়া থেকে আমদানি করা টিএসপি বস্তাপ্রতি ১২০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।

অভিযোগের তালিকায় সাত ডিলার
 
অনুসন্ধানে সাদিয়াতুন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী পরাণ (বাউসী), মাসুদ কুটের বাজার (মেলান্দহ), আবিদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ভুট্টা (শিমুলতলী বাজার), কবির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সেলিম (মেলান্দহ বাজার), রাফিন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা (মেলান্দহ) এবং আল মিজান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শাহীন (মালগুদাম, জামালপুর সদর)—এ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সার কালোবাজারি চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গোডাউনে কর্মরত তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও চক্রটিকে সহযোগিতা করার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ডিলার।

উত্তরবঙ্গে বিক্রির সুযোগ নেই
 
অভিযোগের বিষয়ে আল মিজান ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. শাহীন বলেন, ‘চলতি মাসে তার প্রতিষ্ঠানের নামে ৪৩ বস্তা টিএসপি, ৫৬ বস্তা ডিএপি এবং ৬০–৭০ বস্তা এমওপি বরাদ্দ হয়েছে।’

এ পরিমাণ সার দিয়ে এলাকার কৃষকদের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয় বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘উত্তরবঙ্গে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। আমরা অন্য জায়গা থেকে সার কিনে এনে কৃষকের চাহিদা পূরণ করি।’

আবিদ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ভুট্টা জানান, চলতি মাসে তার নামে ১৭৫ বস্তা ডিএপি, ৬০ বস্তা টিএসপি ও ১০৩ বস্তা এমওপি বরাদ্দ হয়েছে। উত্তরবঙ্গে সার কালোবাজারে বিক্রির বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না বলে দাবি করেন।

সাদিয়াতুন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী পরাণের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

কর্মকর্তার উত্তর— অফিসে আসুন
 
অভিযোগের বিষয়ে মেলান্দহ বিএডিসির উপপরিচালক শওকত আলীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অফিসের কাজে বাইরে আছি। অফিসে আসুন, বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত কথা হবে।’

বস্তাপ্রতি ২০ থেকে ১২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সরাসরি উত্তর দেননি। বরং অফিসে গিয়ে কথা বলার জন্য এ প্রতিবেদককে বলেন।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার এসোসিয়েশনের (বিএফএ) পরিচালক চান মিয়া চানু বলেন, ‘বিএডিসির নিবন্ধিত ডিলারগণ আমার বিএফএর সদস্য না হওয়ার কারণে বিএডিসির সার বিতরণে আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নাই। তারা কিভাবে জামালপুরের ডিলারদের বরাদ্দকৃত সার উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কালোবাজারে বিক্রি করছে সেটা প্রশাসনের নজর দেয়া প্রয়োজন।

কৃষকের সার, কার পকেটে? 

সরকার কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে ভর্তুকি দিয়ে সার সরবরাহ করছে। সেই সার যদি ডিলারের গুদামে পৌঁছানোর আগেই নির্দিষ্ট চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে সরকারি বরাদ্দের সুফল পাচ্ছেন কে—কৃষক, নাকি কালোবাজারি সিন্ডিকেট?

মেলান্দহ বিএডিসি গোডাউন ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু সার কালোবাজারির ঘটনা নয়; বরং সরকারি বরাদ্দ, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের দীর্ঘদিনের কারবারের ইঙ্গিতও বহন করে।

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিএডিসি   সার সিন্ডিকেট   ডিলার   বরাদ্দ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close