দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সময়ে সার সংকটের নানা কথা শোনা যাচ্ছে, সে সময়ে নীলফামারী সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ পরিলক্ষিত হয়েছে। এমন স্বাভাবিক সারের সরবরাহে জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত আমন চারা রোপণ হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে। সার সংকটের গুজবে অনেকেই পরবর্তী আবাদের জন্য সার সংগ্রহে ছুটছেন।
জেলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
কৃষরা বলছেন, ‘আমরা সংকটের গুজব শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে সারের দোনে গিয়ে প্রয়োজনীয় সার মিলছে। তবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি কিনতে চাইলে বাধা আসছে।’
এদিকে সার সংকটের কথা ছড়ালে জেলায় এবার ১ লাখ ১৩ হাজার ২২০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা সবটাই পূরণ হয়েছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলায আমন চারা রোপণ হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২০৫ হেক্টর জমিতে। এ জেলায় কৃষি জমির পরিমান ১ লাখ ২৪ হাজার ৩৯৬ হেক্টর। অবশিষ্ট জমিতে শাকসবজীসহ অন্যান্য মসলা জাতীয় ফসল চাষ হচ্ছে। এ জেলার কৃষক পরিবারের সংখ্যা ৫ লাক ২৮ হাজার ৪ জন।
জেলায় চলতি আমনসহ অন্যান্য ফসলে ব্যবহারের জন্য গত আগস্ট মাসে সারের চাহিদা ছিল ইউরিয়া ৬ হাজার ৩৭৯ মেট্রিকটন, টিএসপি ৫৮৮ মেট্রিকটন, ডিএপি ১হাজার ৮৬১ মেট্রিকটন, এমওপি ১ হাজার ৯৬৮ মেট্রিকটন। চাহিদার অনুকুলে শতভাগ সরবরাহ পাওয়া গেছে। অপরদিকে সেপ্টেম্বর মাসে ইউরিয়া ৩ হাজার ১৫৬. টিএসপি ২২০, ডিএপি ২০০৮ এমওপি ১ হাজার ৭৭ মেট্রিকটন চাহিদার বিপরীতে শতভাগ বরাদ্দ মিলেছে। এসব বরাদ্দ থেকে কৃষকদের মাঝে বিতরণের পর আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত মজুদ রয়েছে ইউরিয়া ১ হাজার ৯১৬, টিএসপি ৮৯, ডিএপি ৭০০, এমওপি ৫৯০ মেট্রিকটন। এ জেলায় সারের ডিলার রয়েছে ২০৬ জন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪৪, সৈয়দপুরে ৩৪, ডোমারে ৩১, ডিমলায় ৩২, জলঢাকায় ৩৫ এবং কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ৩০ জন। এসব ডিলারের মাধ্যমে সার বিতরণ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে জেলা সদরের পলাশবাড়ি বাজারের সার ডিলার মেসার্স পোদ্দার ব্রাদার্সে গিয়ে সার বিতরণের স্বাভাবিক কার্যক্রম লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে মালিকসহ কর্মচারীরা সার বিতরণের জন্য প্রস্তুত থাকলেও প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অবস্থান করেও সার ক্রয়ের জন্য কোন কৃষকের দেখা মেলেনি।
পোদ্দার ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী নিশিত কুমার পোদ্দার জানান, সকাল থেকে বিকাল পৌনে তিনটা পর্যন্ত তার পয়েণ্টে ১০ জন কৃষক সার সংগ্রহ করেছেন। এ সময় সকলের য়ৌক্তিক চাহিদা পূরণ করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত আগস্ট মাসে ৫০ কেজি ওজনের টিএসপি ৬৭ বস্তা, ইউরিয়া ১ হাজার ৮২০ বস্তা, পটাশ ২২৩ বস্তা, ড্যাপ ১৮৭ বস্তা এবং সেপ্টেম্বর মাসে টিএসপি ২৩ বস্তা, পটাশ ১২৪ বস্তা, ড্যাপ ২৩৮ বস্তা, ইউরিয়া ৯২০ বস্তা সরবরাহ পেয়েছেন। এসবের মধ্যে প্রতি কৃষকের মাঝে ইউরিয়া ২ বস্তা এবং অন্যান্য সার ১ বস্তা করে বিতরণ করছেন। বর্তমানে আমনের জমিতে প্রয়োজন না থাকলেও কৃকদের মাঝে টিএসপির চাহিদা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অজ্ঞতার কারণে ফসল লাগানোর পরেও কৃষক জমিতে টিএসপি প্রয়োগ করতে চায়।
তিনি বলেন, ‘আমার পয়েন্টে মজুদ স্বভাবিক আছে। কোন কৃষক সার নিতে এসে ফেরৎ যায়নি এ পর্যন্ত। তবে আগের তুলনায় কৃষির নিবিরতা বেড়েছে। কিন্তু বরাদ্দ আগের মতোই আছে। কৃষির নিবিরতা অনুযায়ী সুষম বরাদ্দ এবং ডিলারদের মাঝে বণ্টন এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে’।
জেলা সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের কৃষক রমজান আলী (৫০) এবার আমন আবাদ করেছেন তিন বিঘা জমিতে।
তিনি বলেন, ‘সময়ের মধ্যে সার কিনে জমিতে প্রয়োগ করতে পেরেছি। এ জন্য কোন ধরনের হয়রানি হয়নি। তরে চারা লাগানোর ২২ দিনের মাথায় টিএসপি সারের প্রয়োজন ছিল। বাজারে বাংলা টিএসপি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে একই সার অন্যান্য কম্পাণীর পাওয়া যাচ্ছে।’
তিনি জানান সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলে সংকটের গুজবে অনেকেই পরবর্তী ফসলের জন্য সার সংগ্রহে আগাম নেমে পড়েছে। এমন গুজবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চড়ামূল্যে বিক্রির জন্য গুদামে মজুদ করছে।
জেলা সদরের টুপামারী ইউনিয়নের অপর কৃষক কারিমুল ইসলাম (৩২) এবার আমন আবাদ করেছেন এক বিঘা জমিতে।
তিনি বলেন, ‘সার সংকটের কথা শুনছি। কিন্তু আমি সারের দোকানে গিয়ে প্রয়োজনমাফিক সার কিনে সময়মতো জমিতে প্রয়োহ করেছি’।
তিনি জানান, সংকটের গুজবে অনেকে সার মজুদ করছেন বলে শুনেছেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি মুনাফার জন্যও মজুদ করছেন। এসব ব্যবসায়ীদের প্রতি প্রশাসন কঠোর হওয়ায় স্বাভাবিক রয়েছে পরিস্থিতি।
আমন চারা লাগানোর আগে টিএসপি সার ব্যবহার করেছেন তিনি। এখন ওই জমিতে টিএসপির প্রয়োজন আচে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘না হলেও চলবে কিন্তু হলে ফসল ভালো হয়’।
এ বিষয়ে নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তরের উপ-পরিচালক মোছা. হুমায়রা মণ্ডল বলেন, ‘সার সংকটের কথা কারা বলছেন, কেন বলছেন সেটি খুঁজে দেখতে হবে। মাঠ পর্যায়ে দেখলে এর বাস্তব প্রতিফলন নেই। এ জেলায় সারের কোন সংকট নেই, ডিলার পয়েণ্টে বেশি দামে বিক্রির কোন ঘটনা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে জমিতে বেশি সার দিলে বেশি ফলন হবে। এ জন্য আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। আমরা টিএসপি সার একবারে প্রয়োগ করতে বলি। অনেক কৃষক সেটি বুঝে না। এছাড়া টিএসপি, ড্যাপ এবং ডিএসপি একই সার। বাজারে টিএসপি কম থাকলেও পর্যাপ্ত ড্যাপ এবং ডিএসপি সার রয়েছে। এসব সারের প্রতিটির গুণগত মান একই। কৃষকদের সচেতনতা বাড়াতে উঠান বৈঠক, কৃষক সমাবেশ এবং কৃষক মাঠ স্কুলে আলোচনা অব্যাহত আছে।’
আমন মৌসুমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে এবং ভালো ফলনের আশা করা যাচ্ছে বলে হুমায়রা মণ্ডল জানান।
কেকে/এমএ