রাজধানী ঢাকায় ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ডসহ যেকোনো আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলায় এক লাখ প্রশিক্ষিত শহর প্রতিরক্ষা দল বা টিডিপি স্বেচ্ছাসেবী সদস্যকে প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সম্ভাব্য দুর্যোগ পরিস্থিতিতে এসব স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকা এবং তাদের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেছেন তিনি। এ সময় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সার্বিক সংস্কার, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চলমান উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতির বিষয়ও মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন মহাপরিচালক।
সাক্ষাৎকালে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাসের রাজধানী ঢাকায় ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন আকস্মিক দুর্যোগের সময় স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত টিডিপি স্বেচ্ছাসেবীদের প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড, জোন ও থানা এলাকাভিত্তিক এসব প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীকে সংগঠিত করে দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর একটি স্থানীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ডিজিটাল তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত থাকবে এসব প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীর তথ্য। ফলে কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত তাদের কাজে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে। দুর্যোগকালীন সময়ে তারা প্রাথমিক সাড়াদানকারী হিসেবে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূমিকা রাখবেন।
পরিকল্পনার আওতায় প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার কার্যক্রম, ত্রাণ বিতরণ এবং বিভিন্ন মানবিক পুনর্বাসন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেবেন। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগের পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতেও তারা ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত এক লাখ টিডিপি স্বেচ্ছাসেবী সদস্যকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মৌলিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ড এবং অন্যান্য আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বিশেষায়িত ও উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়ার রূপরেখাও উপস্থাপন করেন মহাপরিচালক।
এ বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দক্ষ ও সংগঠিত স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যারা স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগের সময় দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে প্রাথমিক সাড়াদান, উদ্ধার এবং মানবিক সহায়তার কাজে যুক্ত হতে পারবেন। এর ফলে বড় ধরনের দুর্যোগের সময় স্থানীয় পর্যায় থেকেই দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রী এ কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে কীভাবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা করেন তিনি।
সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক বাহিনীর চলমান সংস্কার কার্যক্রম এবং সক্ষমতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কেও মন্ত্রীকে অবহিত করেন। পাশাপাশি বাহিনীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং দেশের বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আনসার-ভিডিপি সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
মহাপরিচালক জানান, দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যা এবং অন্যান্য দুর্যোগ পরিস্থিতিতে স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা আনসার-ভিডিপি সদস্যরা প্রাথমিক সাড়াদানকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা দুর্যোগের সময় দ্রুত সাড়া দেওয়া, উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণসহ বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন।
দুর্যোগের সময় স্থানীয় পর্যায়ে আগে থেকে প্রস্তুত থাকা জনবল দ্রুত কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আনসার-ভিডিপির এ সাংগঠনিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও আলোচনায় উঠে আসে। বিশেষ করে দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষিত সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সক্ষম হতে পারেন।
এ ছাড়া উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর বাস্তবায়নাধীন ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর পরিবেশ সহনশীলতা এবং অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি’ প্রকল্প সম্পর্কেও দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।
প্রকল্পটির আওতায় খুব শিগগিরই বাগেরহাট, দিনাজপুর, বরগুনা ও রাঙামাটি এলাকায় স্থানীয় ভিডিপি সদস্যদের জন্য পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন ব্যবস্থা স্থাপনের কার্যক্রম নেওয়া হবে। এর মধ্যে পরিবেশবান্ধব প্ল্যান্ট, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বিপরীত অভিস্রবণ ব্যবস্থা স্থাপনের উদ্যোগ রয়েছে।
এ সময় মন্ত্রী বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাম্প্রতিক উন্নয়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করতে আনসার-ভিডিপি সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তিনি বাহিনীর মহাপরিচালককে ধন্যবাদ জানান।
সাক্ষাৎকালে দুর্যোগ মোকাবিলায় আনসার-ভিডিপি সদস্যদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ আরও কার্যকর করার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। দুর্যোগের আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া, দুর্যোগের সময় দ্রুত সাড়া দেওয়া, ক্ষয়ক্ষতি প্রশমন, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রান্তিক পর্যায়ে কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।
দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতির ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত ও সংগঠিত স্বেচ্ছাসেবী কাঠামো থাকলে আকস্মিক পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সহজ হবে বলে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষ করে ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের মতো পরিস্থিতিতে প্রথম কয়েকটি মুহূর্তে স্থানীয়ভাবে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
মন্ত্রী দেশের যেকোনো দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়োজিত আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সর্বাত্মক সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। দুর্যোগের সময় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে এসব সদস্য যাতে আরও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রশিক্ষিত টিডিপি স্বেচ্ছাসেবীদের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে। এই নেটওয়ার্ক ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন আকস্মিক দুর্যোগের পরপরই স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সাড়া দেওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ একটি নগরে বড় ধরনের দুর্যোগের সময় স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুত থাকা প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কার্যক্রমকে আরও কার্যকরভাবে সহযোগিতা করার সুযোগ তৈরি হবে।
কেকে/এআই