রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর      ঢাকা উত্তরে আসিফ ও দক্ষিণে পাটওয়ারীকে এনসিপির মেয়র প্রার্থী ঘোষণা      ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৫৬১      আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধানে দুদক      স্থানীয় নির্বাচনে শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান প্রতিমন্ত্রীর      ফেনীতে প্রধানমন্ত্রীর ১৭ সেপ্টেম্বরের সফর স্থগিত      আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞার প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জের রিট খারিজ      
অর্থনীতি
এক কম্পিউটার থেকে ৪৩ কোটি টাকার প্রতিষ্ঠান ‘ইনপুট বাংলা’
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:২৫ পিএম
ছবি: প্রতিবেদক

ছবি: প্রতিবেদক

একটি কম্পিউটার। ছোট্ট একটি ভাড়া ঘর। হাতে সীমিত পুঁজি। সেখান থেকেই শুরু। এক দশক পর সেই উদ্যোগের সম্পদমূল্য প্রায় ৪৩  কোটি টাকা। শুধু ব্যবসা নয়, তৈরি হয়েছে প্রায় ৩৬০ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান। মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার জাকির হোসেনের ‘ইনপুট বাংলা’ এখন কাজ করছে বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের ক্লায়েন্টের সঙ্গে। 

ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন ছিল জাকিরের। বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু নিরাপদ চাকরির পথ ছেড়ে তিনি বেছে নেন প্রযুক্তির অনিশ্চিত জগৎ। সেই ঝুঁকির সিদ্ধান্তই আজ তাকে নিয়ে গেছে বড় সাফল্যের জায়গায়। 

শ্রীমঙ্গল দি বাডস্ রেন্সিডেসিয়্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি এবং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে অনার্স সম্পন্ন করেন জাকির হোসেন। পড়াশোনা শেষে তার লক্ষ্য ছিল ব্যাংকে চাকরি করা। একই সঙ্গে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের শেষ দিকে ঢাকায় ফ্রিল্যান্সার এক বন্ধুর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর চাকরির প্রচলিত পথ বাদ দিয়ে বন্ধুর সঙ্গে অংশীদারিত্বে শ্রীমঙ্গলে ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
 
২০১৫ সালের শুরুতে পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল শহরের মৌলভীবাজার সড়কের ১ নম্বর পুল এলাকায় ছোট একটি ভাড়া ঘরে যাত্রা শুরু হয় ‘ইনপুট বাংলা’র। তখন ছিল মাত্র একটি কম্পিউটার। ছিল না বড় অফিস, আধুনিক অবকাঠামো কিংবা বড় বিনিয়োগ। কাজ করতে করতেই শেখা—আর শেখার জন্য ঢাকার বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং প্রতিষ্ঠানে ছুটে যাওয়া। এভাবেই প্রায় আড়াই বছর ধরে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন জাকির। তারপর ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে চিত্র।

সরেজমিনে শহরতলীর দক্ষিণ শাহিবাগ এলাকায় অবস্থিত ফ্রিল্যান্সিং এ প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী শত শত তরুণ-তরুণী কম্পিউটারের বড় পর্দায় চোখ রেখে গভীর মনোযোগে কাজ করছেন। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ বেকার, আবার কেউ স্বল্পশিক্ষিত। শ্রীমঙ্গলের মতো মফস্বল শহরে বসেই তারা মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দর্শে  নানা ধরণের সার্ভিস দিয়ে আসছেন।

৩০ দেশের কাজ শ্রীমঙ্গলে

এখন শ্রীমঙ্গলে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রতিষ্ঠানের কাজ করছে ‘ইনপুট বাংলা’। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকাসহ প্রায় ৩০টি দেশের ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রোপার্টি ম্যানেজমেন্ট থেকে ডাটা এন্ট্রি, ডাটা রিসোর্স, ভার্চুয়াল ল’ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ইমিগ্রেশন ল’ ডাটা এন্ট্রি, ডাটা ট্রান্সফার, ফরম প্রসেসিং, ই-মেইল মার্কেটিং, গ্রাফিকস ডিজাইন মার্কেটিং ও রিমোট ভিডিও মনিটরিং–বিভিন্ন ধরনের সেবা দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। 

২০২৫ সালে শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের শাহিবাগ এলাকায় নতুন পরিসরে কার্যক্রম শুরু করে প্রতষ্ঠানটি। বর্তমানে তিন শিফটে কাজ করছেন প্রায় ৩৬০ জন তরুণ-তরুণী। জাকির হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সম্পদমূল্য প্রায় ৪৩ কোটি টাকা, যা প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।

ছয় মাসেই টার্নওভার ৩ কোটি ৪৯ লাখ
 
শুধু সম্পদমূল্য নয়, বাড়ছে ব্যবসার পরিমাণও। ২০২৪ সালে ‘ইনপুট বাংলা’র বার্ষিক টার্নওভার ছিল প্রায় ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই প্রতিষ্ঠানটির টার্নওভার ৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলতে এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে বলে জানান জাকির।

চা-শ্রমিকের সন্তানও এখন ফ্রিল্যান্সার 

‘ইনপুট বাংলা’র সাফল্যের আরেকটি দিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি। শুধু শহরের শিক্ষিত তরুণ-তরুণী নয়, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকেও কাজের সুযোগ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে চা-শ্রমিক পরিবারের অনেক ছেলে-মেয়ে বর্তমানে এখানে কাজ করছেন। দূরবর্তী এলাকার কর্মীদের জন্য রয়েছে নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা। মোটামুটি ইংরেজিতে দক্ষ তরুণ-তরুণীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিনমাস পর্যন্ত বিনা মূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী দেওয়া হয় বেতন। 

জাকির জানান, প্রতিষ্ঠানে কয়েক বছর কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পর কয়েকজন কর্মী নিজেরাই প্রতিষ্ঠান গড়ে সফল হয়েছেন। ফলে প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তাও। 

‘চাকরি নয়, কর্মসংস্থান তৈরি করতে চেয়েছি  দৈনিক খোলা কাগজের সঙ্গে আলাপকালে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ফ্রিল্যান্সার জাকির হোসেন জানান, তার পথচলা শুরু হয়েছিল চাকরির (ব্যাংকার) স্বপ্ন নিয়ে। বিসিএস দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেই হয়ে উঠেছেন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোক্তা। 

তার ভাষ্যে, মফস্বলের তরুণদের প্রযুক্তিনির্ভর কাজে যুক্ত করার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার, নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ বিদ্যুৎ এবং উন্নত কর্মপরিবেশ।

১০ বছরের স্বপ্ন–‘টেক সিটি’ শ্রীমঙ্গল
 
একটি কম্পিউটার দিয়ে শুরু করা সেই ছোট উদ্যোগ এখন শত শত তরুণ ও তরুণীর কর্মস্থল। এখানেই থামতে চান না জাকির। আগামী ১০ বছরের মধ্যে শ্রীমঙ্গলকে একটি সম্ভাবনাময় ‘টেক সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। তার লক্ষ্য, ফস্বলের তরুণদের ঢাকামুখী না করে শ্রীমঙ্গলেই বিশ্ববাজারের কাজের সঙ্গে যুক্ত করা। 

একটি কম্পিউটার থেকে শুরু হওয়া যে যাত্রা আজ ৪৩ কোটি টাকার প্রতিষ্ঠানে পৌঁছেছে, সেটিই যেন বলে দেয়–বিশ্ববাজারে কাজ করতে রাজধানীতে অফিস থাকা জরুরি নয়। প্রয়োজন দক্ষতা, প্রযুক্তি আর সাহস করে শুরু করার মানসিকতা। ফ্রিল্যান্সিং ও প্রযুক্তিখাতের বিকাশে সরকারের ব্যাপক পৃষ্টপোষকতা প্রয়োজন বলে মনে করেন জাকির হোসেন। বিশেষ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার, দ্রুতগতির ইন্টারনেট, ব্যাকআপ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং উন্নত কর্মপরিবেশ অত্যন্ত জরুরি।

কেকে/এআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  শ্রীমঙ্গল   উদ্যোক্তা   প্রতিষ্ঠান  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

অর্থনীতি- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close