বিদ্যুৎ থাকে না, বাড়ছে গরমের ভোগান্তি। আর ঘন ঘন এ লোডশেডিং সামাল দিতে বাড়ছে মানুষের খরচ। কেউ চিকিৎসার জন্য জমানো টাকা খরচ করে কিনছেন চার্জার ফ্যান, কেউ পুরোনো ফ্যান মেরামত করছেন, আবার কেউ নতুন করে কিনছেন ব্যাটারিচালিত ফ্যান। এতে একদিকে যেমন গরমে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে লোডশেডিং মোকাবিলায় পরিবারগুলোর ওপর পড়ছে বাড়তি আর্থিক চাপ।
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশু, শিক্ষার্থী ও বয়স্করা। গরমে ঘরে স্বস্তি পেতে অনেকেই বাধ্য হয়ে কিনছেন চার্জার ফ্যান।
উপজেলার বাসিন্দা সখিনা বেগম (৫০) জানান, তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য তার ছেলে প্রবাস থেকে টাকা পাঠিয়েছেন। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় গরমে তার দুই বছরের নাতি অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় চিকিৎসা করানোর আগে নাতির জন্য একটি চার্জার ফ্যান কেনার কথা ভাবছেন তিনি।
সখিনা বেগম বলেন, ‘নাতির বয়স প্রায় দুই বছর। গরম সহ্য করতে পারে না। ঘন ঘন কারেন্ট চলে যাওয়ায় ঠিকমতো ঘুমাতে পারে না। কতক্ষণ আর হাতপাখা দিয়ে বাতাস করা যায়। তাই চিকিৎসার জন্য পাঠানো টাকা থেকে প্রায় ৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি চার্জার ফ্যান কিনতে হবে।’
আড়াইপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক ফজল বলেন, ‘কারেন্ট না থাকায় বাধ্য হয়ে ১ হাজার ৩০০ টাকা দিয়ে নতুন একটি চার্জার ফ্যান কিনেছি। আগের ফ্যানটিও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ৭০০ টাকা দিয়ে মেরামত করছি। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে আমার বাড়তি খরচ হচ্ছে। আবার ভ্যান-অটোও ঠিকমতো ফুল চার্জ দিতে পারছি না। এতে আয়ও কমে গেছে।’
কালিয়া ইসলামিয়া সিনিয়র মাদরাসার সহকারী শিক্ষক আবু হানিফ বলেন, ‘শুধু ফ্যান কেনা বা মেরামতের খরচই নয়, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন কাজেও সমস্যা হচ্ছে। অনেক সময় সকালে বিদ্যুৎ থাকে না। এতে কর্মস্থলে যাওয়ার আগে রান্নাবান্নাসহ প্রয়োজনীয় কাজ সময়মতো করা যাচ্ছে না।’
এদিকে লোডশেডিং বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সখীপুরের স্থানীয় ইলেকট্রনিকসের দোকানগুলোতে বেড়েছে চার্জার ফ্যানের চাহিদা।
ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী রাসেল মিয়া বলেন, ‘গত বছর যে পরিমাণ চার্জার ফ্যান বিক্রি হয়েছে, এ বছর তার চেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ বৈদ্যুতিক ফ্যানের তুলনায় এখন চার্জার ফ্যানের বিক্রিই বেশি।’
বেসরকারি ইলেকট্রনিকস কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি আশিক বলেন, ‘সর্বশেষ বৃষ্টির পর রোদ ও গরম বেড়ে যাওয়ায় চার্জার ফ্যানের চাহিদা আরও বেড়েছে।’
চার্জার ফ্যান কিনতে আসা জাহাঙ্গীর আলম বাদশা বলেন, ‘আগে চার্জার ফ্যান অনেকটা প্রয়োজনের বাইরে থাকা পণ্য ছিল। কিন্তু এখন ঘন ঘন কারেন্ট চলে যাওয়ায় এটি মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। কয়েকদিন চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত ছেলের জন্য একটি ফ্যান কিনতে এসেছি। ছেলেটা গরম সহ্য করতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় শুধু অন্ধকার বা গরমের কষ্টই হচ্ছে না, এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে বাড়তি আর্থিক চাপ। যাদের ঘরে আগে থেকেই বৈদ্যুতিক ফ্যান রয়েছে, তারাও লোডশেডিংয়ের সময় স্বস্তি পেতে নতুন করে চার্জার ফ্যান কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে একই প্রয়োজন মেটাতে একটি পরিবারকে দুই ধরনের ফ্যানের পেছনে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, গরমের মধ্যে ঘন ঘন ও দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে জনজীবন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। দ্রুত লোডশেডিং কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কেকে/এআই