সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৬ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: বিশ্ববাজারে তেলের দামে ধস      জ্বালানিতে জ্বলবে জনগণ      নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী      লিটারে ২০ টাকা বাড়ল ডিজেল-পেট্রোল-অকটেনের দাম      সেপ্টেম্বরের ১৯ দিনে রেমিট্যান্স এলো ২৩ হাজার ৮৭ কোটি টাকা      ৩৫ জন সফর সঙ্গীসহ প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্ক যাচ্ছেন আগামীকাল      রামিসার মতো অপ্রতিম হত্যার বিচারও দ্রুত শেষ হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
কৃষিতে মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ জরুরি
ইয়াহিয়া নয়ন
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখের বেশি। অথচ সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের জন্য নিবন্ধিত কৃষক মাত্র প্রায় ১০ লাখ ৬৮ হাজার। কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তাই পুরো ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। 

‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল : বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ নামক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি মাঝারি চালের গড় বিক্রয়মূল্য ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা। ভোক্তা পর্যায়ে একই চাল বিক্রি হয় গড়ে ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা কেজি দরে। অর্থাৎ কৃষক পর্যায়ের তুলনায় খুচরা বাজারে চালের দাম প্রায় ১০০ শতাংশ বেড়ে যায়। দাম বৃদ্ধির এমন প্রবণতা ডাল, দেশি পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, আলু, বেগুন ইত্যাদি খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রেও রয়েছে বলে তাতে উল্লেখ রয়েছে। 

সংস্থাটির গবেষণা মতে, কোনো পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল যত দীর্ঘ, ভোক্তাপর্যায়ে সে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিও তত বেশি। বিপরীতে যেসব পণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত এবং মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা কম, সেসব পণ্যের দামও সীমিত হারে বাড়ে।

হরহামেশা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এ চিত্র দেখা যায়। এটি কৃষিপণ্য ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা থেকে হয়। অথচ এতে কেবল কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এমন নয়। দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার অন্যতম কারণ এটি। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতিতে চালের ভারিত গড় বেশি। যদিও এ পরিস্থিতি এড়ানো যেত যদি সরকার সরাসরি কৃষকদের থেকে ফসল সংগ্রহ করে মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিত।

এটা সত্য যে, সরকার কৃষকের কাছ থেকে ধান এবং মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করে। কিন্তু বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক প্রভাব, কৃষকের তালিকায় অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের যে অভিযোগ ছিল, বর্তমান সরকারের প্রথম বোরো মৌসুমেও বিভিন্ন এলাকায় প্রায় একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। ফলে সমস্যা কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার নয়; সরকারি সংগ্রহের কাঠামোতেই পরিবর্তন প্রয়োজন। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সরকারি সংগ্রহের পরিমাণ ও ধরনে। 

দেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখের বেশি হলেও সরকারি গুদামে ধান সরবরাহের জন্য নিবন্ধিত কৃষক প্রায় ১০ লাখ ৬৮ হাজার। আবার চলতি বোরো মৌসুমে ২ কোটি ২৬ লাখ টন ধান উৎপাদন লক্ষ্যের বিপরীতে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল মাত্র পাঁচ লাখ টন। পরে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ ৭৮ হাজার টন করা হলেও উৎপাদনের তুলনায় তা খুবই সামান্য। বিপরীতে মিলারদের কাছ থেকে ১২ লাখ টনের বেশি সেদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে সরকারি ক্রয়ের সুবিধা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ সীমিতই থাকছে।

এ ব্যবস্থায় মিলারদের ভূমিকা প্রয়োজনীয় হলেও কৃষকের জায়গা তাদের দিয়ে পূরণ করা যায় না। ধান সংগ্রহ করে মিলারদের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে চাল সরকারি গুদামে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু সরকারি সংগ্রহের মূল উদ্দেশ্য যদি কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা হয়, তাহলে সংগ্রহের প্রথম ধাপটি কৃষককেন্দ্রিক হওয়া জরুরি।

তাছাড়া বর্তমানে আর্দ্রতার মাত্রা, চিটা ধানের সীমা, ধান শুকানোর ব্যবস্থা, পরিবহন, সংগ্রহ কেন্দ্রের দূরত্ব, নিবন্ধন ও লটারিসহ নানা শর্ত ক্ষুদ্র কৃষকের অংশগ্রহণে বাধা তৈরি করছে। সরকারের নিজস্ব গবেষণাতেও এসব সমস্যার কথা উঠে এসেছে। তাই সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনে তা নির্ধারিত মিলারের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে সরকারি গুদামে নেওয়া যেতে পারে। এতে মিলারদের প্রয়োজনীয় ভূমিকা বজায় থাকবে, কিন্তু সরকারি ক্রয়ের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কৃষককে আর তাদের ওপর নির্ভর করতে হবে না।

এক্ষেত্রে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ই-প্যাডি ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে। সেখানে কৃষকের নিবন্ধন, ধান বিক্রির সময় নির্ধারণ, সংগ্রহ কেন্দ্রে সরবরাহ এবং অর্থ প্রদানের তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় রাখা হয় এবং কৃষকের কাছ থেকেই সরাসরি ধান সংগ্রহ করা হয়। ফিলিপাইনেও সরকারি সংস্থা কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ করে এবং বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ক্রয় মূল্য নির্ধারণ করে। এটিও বিবেচনা করা যেতে পারে। 

আমাদের দেশেও নিবন্ধন থেকে শুরু করে ধান সরবরাহ, ওজন, আর্দ্রতা পরীক্ষা ও অর্থ প্রদান— পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটালভাবে ট্র্যাক করা দরকার। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। সংগ্রহ কেন্দ্রে ধান শুকানোর ব্যবস্থা, অস্থায়ী সংগ্রহ কেন্দ্র, পরিবহন সহায়তা এবং সহজ অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আর্দ্রতার মতো কারিগরি শর্তও কৃষকের বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনায় নির্ধারণ করতে হবে। আবার উৎপাদনের তুলনায় সরকারি ধান সংগ্রহের পরিমাণ বাড়াতে হবে। মাত্র কয়েক লাখ টন ধান কিনে দেশের কোটি কৃষকের বাজারদর সুরক্ষা করা সম্ভব নয়। কত শতাংশ ধান সরকার সংগ্রহ করবে, তা খাদ্য মজুতের প্রয়োজন ও বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা যেতে পারে। 

রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ ব্যবস্থায় শুধু নতুন তালিকা বা নতুন নির্দেশনা এলেই হবে না। কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ, সহজ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। কৃষক উৎপাদন করবেন, মিলার প্রক্রিয়াজাত করবেন, আর সরকারের কাজ হবে কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্য দামে সরাসরি ধান সংগ্রহ করে সেই ধানকে খাদ্য মজুতে পরিণত করা। আর এটিই সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থার সংস্কারের মূলনীতি হওয়া উচিত।

লেখক : সাংবাদিক

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close