রোববার, ১ নভেম্বর ২০২৬,
১৭ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ১ নভেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● জাতীয় অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি যুবসমাজ : প্রধানমন্ত্রী      ● ফ্যাসিবাদ রুখতে রাজনৈতিক ঐক্যের বিকল্প নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● কোনাবাড়ী থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত সব পোশাক কারখানা ছুটির ঘোষণা      ● রাজশাহী বোর্ডে এইচএসসিতে ফলাফল বিপর্যয়      ● হাম উপসর্গে আরও একজনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১২৫২      ● এইচএসসিতে পাসের হারে শীর্ষে ঢাকা, তলানিতে বরিশাল      ● এইচএসসি পরীক্ষা : ২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাস করেননি কোনো শিক্ষার্থী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
গ্রিনল্যান্ড চুক্তি : কূটনীতি বনাম ভাবমূর্তি
ফরহাদ নাইয়া
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম আপডেট: ২১.০৯.২০২৬ ১২:১০ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত নতুন নিরাপত্তা চুক্তি প্রথম দেখায় স্বস্তির খবর। প্রায় দুবছর ধরে ওয়াশিংটনের চাপ ও হুমকির মুখে থাকা গ্রিনল্যান্ডবাসী এবং ডেনমার্কের জন্য এটি বড় ধরনের আশ্বাস হতে পারে। ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাদের ঘোষিত ‘রেড লাইন’ অক্ষুণ্ন থাকছে বলে মনে হচ্ছে। বিরোধটি আবার কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তানীতির প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি সম্ভব। তবে চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশিত হয়নি। এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, তার প্রায় সবটাই এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১৮-১৯ সেপ্টেম্বরের সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট থেকে। সে বক্তব্যের ওপর ভর করেই এই চুক্তির মূল্যায়ন করতে হচ্ছে।

আলজাজিরাসহ বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে : এ চুক্তিতে ‘নতুন’ আসলে কতটা? যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে চাইলে ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনেই তা অনেকাংশে সম্ভব ছিল। চুক্তিটি ২০০৪ সালে হালনাগাদ হয়, তখন গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসিত সরকারও এর পক্ষভুক্ত হয়। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় ওয়াশিংটন এ অধিকার পুরোমাত্রায় কাজে লাগিয়েছিল। তখন গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ১৭টি সামরিক স্থাপনা ও দশ হাজারেরও বেশি সেনা ছিল। এখন টিকে আছে শুধু পিটুফিক স্পেস বেস (সাবেক থুলি এয়ার বেস), যেখানে সেনা প্রায় ১৫০ জন। ট্রাম্পের বক্তব্য সত্য ধরে নিলে অন্তত দুটি পরিবর্তন চোখে পড়ে।

প্রথমত, তিনি এ চুক্তিকে ‘ইনফিনিট লাইফ’ বা অনন্ত মেয়াদের চুক্তি বলেছেন। ১৯৫১ সালের চুক্তি কার্যকর থাকার কথা ছিল উত্তর আটলান্টিক চুক্তি (ন্যাটো) যতদিন বহাল থাকে ততদিন। অর্থাৎ পুরোনো ব্যবস্থাটি ছিল ন্যাটোর অস্তিত্বের সঙ্গে বাঁধা। নতুন চুক্তি সেই বাঁধন থেকে মুক্ত হলে তা ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্পের সীমিত অঙ্গীকার এবং তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির প্রতিফলন বলেই ধরা যায়।

দ্বিতীয়ত, তিনি লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিপক্ষ তাদের ‘স্পষ্ট লিখিত অনুমোদন’ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডে ঘাঁটি বা সামরিক উপস্থিতি গড়তে কিংবা স্পর্শকাতর খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না। এর অর্থ, রাশিয়া বা চীনের মতো দেশকে ঠেকানোর একটি আনুষ্ঠানিক ভেটো ক্ষমতা ওয়াশিংটন পেল। যদিও বাস্তবে এ ক্ষমতা আগেও অনেকটা ছিল। ২০১৬ সালে দক্ষিণ গ্রিনল্যান্ডের কাঙ্গিলিন্নগুইতের পরিত্যক্ত নৌঘাঁটি কিনতে চীনা একটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালে ডেনমার্ক হস্তক্ষেপ করেছিল। ২০১৮ সালে গ্রিনল্যান্ডের বড় বিমানবন্দর প্রকল্পে চীনা নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণও ঠেকিয়ে দেওয়া হয়। এখন থেকে এ ধরনের ক্ষেত্রে ডেনমার্কের আনুষ্ঠানিক হস্তক্ষেপ হয়তো আর প্রয়োজনই হবে না।

এ ব্যাখ্যা ঠিক হলে বলা যায়, কাগজে-কলমে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে, কিন্তু বাস্তবে পরিবর্তন তুলনামূলক সীমিত। এটাকে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ হিসেবেও দেখা যায়। উচ্চপর্যায়ের কার্যনির্বাহী দলে তারা ট্রাম্পকে এমন একটি ‘জয়’ উপহার দিয়েছেন, যা তার রাজনৈতিক প্রয়োজনে দরকার ছিল, অথচ সার্বভৌমত্ব অটুট রেখেছেন। একে কেউ ‘ভাবমূর্তির জয়’ বললে অত্যুক্তি হয় না। ট্রাম্প সমর্থকদের কাছে বিজয়ী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন, তার মিত্র রাজনীতিক ও গণমাধ্যম ইতোমধ্যে চাপ প্রয়োগের কৌশলের সাফল্য নিয়ে উচ্ছ্বসিত। অন্যদিকে উত্তেজনাও প্রশমিত হয়েছে।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন স্পষ্ট করেছেন, চুক্তিটি ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার স্বীকার করে। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটির ওপর মালিকানা বা সার্বভৌমত্ব পাচ্ছে না। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ট্রাম্প আগে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন এবং এমনকি জোর করে নেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের বক্তব্যের একটি বাক্য বিশেষভাবে নজর কাড়ে : চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কোনো খরচ নেই’। এটি সত্য হলে খরচটা কার ঘাড়ে যাবে, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠবে। ডেনমার্কের করদাতাদের জন্য তা স্বস্তিদায়ক হওয়ার কথা নয়।

তবে ট্রাম্পের অতীত প্রতিশ্রুতির রেকর্ডও মনে রাখা দরকার। মেক্সিকো সীমান্তের দেয়ালের খরচ শেষ পর্যন্ত মেক্সিকো দেয়নি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলে আমেরিকানরা যে ৫ হাজার ডলার পাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা কতটা বাস্তবায়িত হবে, সেটিও দেখার বিষয়। আবার বর্ধিত মার্কিন সামরিক উপস্থিতি থেকে গ্রিনল্যান্ড নিজেও অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে, সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডে কোনো নন-ন্যাটো ঘাঁটি বা সেনা উপস্থিতি নিষিদ্ধ করছে এবং চীন-রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষদের বিনিয়োগেও সীমাবদ্ধতা আনছে। কিন্তু এর আইনি ভাষা, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এবং আর্থিক দায়-দায়িত্ব কে বহন করবে—তা এখনো পরিষ্কার নয়। গ্রিনল্যান্ডের এ ঘটনা ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রের জন্য কিছু লেসন রেখে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে আছে, তাই এ শিক্ষাগুলো আমাদের জন্যও প্রাসঙ্গিক।

চাপের মুখে আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনার কাঠামো বজায় রেখেছিল, ফলে বিরোধ আবার কূটনৈতিক পরিসরে ফিরেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শক্তিধর পক্ষকে রাজনৈতিক জয়ের সুযোগ দিয়ে মৌলিক স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব। প্রতীকী ছাড় ও কাঠামোগত ছাড়ের মধ্যে পার্থক্য বোঝা কূটনীতির মূল দক্ষতা। এই চুক্তিতে সেটি কতটুক ঘটেছে তা দেখবার বিষয়।

চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ ও সংসদীয় জবাবদিহি অপরিহার্য। ‘অনন্ত মেয়াদ’ কিংবা ‘লিখিত অনুমোদন’-এর মতো শর্তের সুনির্দিষ্ট আইনি ভাষা না জানা পর্যন্ত চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যায় না। বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের প্রকৃত ব্যয় আগে থেকে স্পষ্ট হওয়া উচিত। ‘কোনো খরচ নেই’ ধরনের ঘোষণা যাচাই না করে গ্রহণযোগ্য নয়।

গ্রিনল্যান্ডের এ চুক্তি আপাতত একটি স্বস্তির অধ্যায়। তবে এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে চুক্তির পাঠ প্রকাশের পর এবং তার বাস্তব প্রয়োগে। ততদিন এটিকে সতর্ক অথচ আশাবাদের দৃষ্টিতে দেখাই বিবেচনাপ্রসূত।

লেখক : সহ-সম্পাদক, খোলা কাগজ

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close