প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া নিয়ে গণমাধ্যমের অংশীজনদের সঙ্গে সরকারের কনসালটেশন সভা একটি ইতিবাচক সূচনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, আইনটি যেন কোনোভাবেই নিপীড়নমূলক না হয় এবং কোনো সাংবাদিক বা গণমাধ্যম যেন এর শিকার না হন। খসড়া সংশোধনে ১৫ দিনের সময়সীমায় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তও প্রশংসনীয়।
তবে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান ঘোচাতে হলে এখন প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট, আইনি কাঠামোয় প্রতিফলিত পদক্ষেপ। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, অস্পষ্ট ভাষার আইন ক্ষমতাসীনদের হাতে ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। খসড়ায় এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যার কোনো সংজ্ঞা নেই। সংজ্ঞাহীন শব্দ যত ইচ্ছা ব্যাখ্যা করা যায়, আর সেখানেই অপপ্রয়োগের ঝুঁকি।
এ ছাড়া সংবাদপত্রের ডিজিটাল সংস্করণ, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও মাল্টিমিডিয়া কনটেন্টের জন্য খসড়ায় কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা নেই। অথচ আজকের সংবাদ প্রকাশের বড় অংশই ডিজিটাল মাধ্যমে হয়।
গণমাধ্যমের বিচারে মোবাইল কোর্টের এখতিয়ার নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তা আরও গুরুতর। নির্বাহী বিভাগের হাতে তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা সংবাদ প্রকাশের মতো বিষয়ে প্রয়োগ হলে বিচারিক স্বাধীনতা ও ন্যায় বিচারের নীতি ক্ষুণ্ন হয়। সংবাদ প্রকাশের বৈধতা যাচাই হওয়া উচিত আদালতে, দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে; নির্বাহী আদেশে নয়।
আমরা মনে করি, খসড়া চূড়ান্ত করার আগে সরকারের নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত। আইনে ব্যবহৃত প্রতিটি অপরাধ-সংক্রান্ত শব্দ ও ধারার সুনির্দিষ্ট, সীমিত ও নির্ভুল সংজ্ঞা থাকতে হবে। অস্পষ্ট বা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ শব্দ বাদ দিতে হবে। সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল ও মাল্টিমিডিয়া সংবাদমাধ্যমের পেশাদার সাংবাদিকতা এই আইনের আওতা থেকে সুরক্ষিত রাখার সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে।
সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রেস কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার নিশ্চিত করা যেতে পারে। রগণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে মোবাইল কোর্টের ক্ষমতা রাখা যাবে না। কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বা গ্রেপ্তারের আগে আদালতের পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করার যে প্রতিশ্রুতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন, তা মৌখিক আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না রেখে আইনের ধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের বা হয়রানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখতে হবে। পর্যালোচনা কমিটিতে সম্পাদক পরিষদ, অ্যাটকো, সাংবাদিক সংগঠন, আইনবিশেষজ্ঞ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। কমিটির সুপারিশ প্রকাশ করতে হবে এবং সংসদে উপস্থাপনের আগে আবারও জনমত নিতে হবে।
সভায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ও পেশাগত আচরণের যে কথা বলেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার দাবি যেমন ন্যায্য, তেমনি নির্ভুলতা, নিরপেক্ষতা ও নৈতিকতার মানদণ্ড ধরে রাখাও সাংবাদিকদের দায়িত্ব। তথ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবিত পেশাগত স্বীকৃতির কাঠামো নিয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত গঠনমূলক ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া।
তবে সেই কাঠামো যেন সরকারি নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয়ে স্বাধীন, স্বশাসিত ও পেশাজীবীদের দ্বারা পরিচালিত হয়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। কে সাংবাদিক, তা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে গেলে সেটিই হবে নতুন নিয়ন্ত্রণের পথ। সাইবার অপরাধ দমন ও নাগরিকের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে মত প্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়।
সরকার বলছে, গণমাধ্যমকে টার্গেট করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। এই অঙ্গীকারের প্রমাণ মিলবে আইনের চূড়ান্ত পাঠে। সময় কম, কিন্তু সুযোগ বড়। সরকার যদি সত্যিই একটি নিপীড়নমুক্ত আইন চায়, তবে এখনই সংশোধনের এই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে, আর সেটি হতে হবে স্বচ্ছভাবে, সবার অংশগ্রহণের ওপর ভিত্তি করে।
কেকে/ এমএস