বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● চার জেলায় নতুন ডিসি      ● এক দিন বেড়ে দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের ছুটি, প্রধানমন্ত্রী বাড়ালেন অনুদানও      ● দেশে হামে মৃত্যু ছাড়ালো ১১০০      ● ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, সর্বোচ্চ আক্রান্ত ঢাকা বিভাগে      ● হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু      ● একনেকে ১৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ১৩ প্রকল্প অনুমোদন      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়তে কি বদলাতে হবে?
ড. মো. মাহমুদুল আলম
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৫৪ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

জাতীয় বেতনস্কেল নিয়ে আলোচনা শুরু হলে আমাদের মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই যায় কে কোন গ্রেডে থাকলেন, কার বেতন কত বাড়ল এবং কোন পেশা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেল। এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেতন, সুযোগ-সুবিধা ও কর্মজীবনের অগ্রগতির সম্ভাবনা মানুষের পেশা নির্বাচন, কর্মপ্রেরণা এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

কিন্তু একটি জাতীয় বেতনকাঠামোর আরও গভীর অর্থ আছে। এটি তরুণদের কাছে রাষ্ট্রের একটি সংকেত—দীর্ঘ শিক্ষা, বিশেষায়িত দক্ষতা, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং জ্ঞান সৃষ্টিকে আমরা কতটা মূল্য দিই।

৩১ আগস্ট সরকার জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন করেছে। মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে এবং বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হবে। সরকার নিম্ন গ্রেডের কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। সামাজিক ন্যায্যতার এই দিকটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও জরুরি—উচ্চদক্ষতা, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, বিরল বিশেষজ্ঞ জ্ঞান, গবেষণা এবং সৃজনশীল কাজের জন্য আমরা কি যথেষ্ট শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রণোদনা তৈরি করছি?

আসলে প্রশ্নটি আরও বড়—বাংলাদেশ আগামী ২০ বা ৩০ বছরে কেমন সমাজ ও অর্থনীতি হতে চায়, এবং সেই বাংলাদেশ গড়তে কোন ধরনের মেধা, দক্ষতা ও প্রতিষ্ঠান আজ থেকেই তৈরি, আকৃষ্ট এবং ধরে রাখতে হবে?

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতি। সরকারের প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। একই সময়ে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিও চলছে। বর্তমান সূচি অনুযায়ী ২৪ নভেম্বর ২০২৬ উত্তরণ নির্ধারিত আছে; তবে বাংলাদেশ অতিরিক্ত প্রস্তুতিকাল চেয়েছে এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত এখনো বাকি। অর্থাৎ সামনে শুধু আয় বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়, উন্নয়নের ধরন বদলানোর চ্যালেঞ্জও রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের World Development Report ২০২৪ এই পরিবর্তনকে একটি সহজ ধারণায় ব্যাখ্যা করেছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ শুধু বিনিয়োগ বাড়িয়ে দীর্ঘদিন দ্রুত এগোতে পারে না; তাকে বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি ও ভালো ব্যবসায়িক পদ্ধতি দেশে এনে ছড়িয়ে দিতে হয়। আর উচ্চ-মধ্যম আয়ের পর্যায়ে এর সঙ্গে নিজস্ব উদ্ভাবন যোগ করতে হয়। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ পরিষ্কার: রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ ও কারখানা অবশ্যই দরকার, কিন্তু একইসঙ্গে দরকার দক্ষ মানুষ, নতুন জ্ঞান, প্রযুক্তি আত্মস্থ করার সক্ষমতা এবং প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারণ।

উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক সূচক আমাদের কী শেখায়?

বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থার গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স (GII)-কে সহজভাবে একটি দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতার বহুমাত্রিক রিপোর্ট কার্ড বলা যায়। প্রায় ৮০টি সূচকের মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো, অর্থায়ন, ব্যবসায়িক সক্ষমতা, প্রযুক্তি, জ্ঞানপ্রবাহ এবং সৃজনশীল ফলাফল মিলিয়ে একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করা হয়।

এটি নিখুঁত মাপকাঠি নয়; বছরভেদে তথ্যের প্রাপ্যতা ও পদ্ধতির পরিবর্তনেও অবস্থান বদলাতে পারে। তাই একটি মাত্র অবস্থান দিয়ে কোনো দেশের ভবিষ্যৎ বিচার করা উচিত নয়।

২০২৫ সালে ১৩৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থান ১০৬। GII নিজেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য অবস্থানের পরিসর ৯৭ থেকে ১১০ দেখিয়েছে। ভেতরের ছবিটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। উদ্ভাবনের ভিত্তিগত সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম, কিন্তু উদ্ভাবনী ফলাফলে ৯৫তম। সৃজনশীল ফলাফলে অবস্থান ৮৬তম। অর্থাৎ সীমিত ভিত্তি থেকেও বাংলাদেশ কিছু তুলনামূলক ভালো ফল তৈরি করছে।

শ্রম উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধিও GII-এর হিসাবে বাংলাদেশের একটি শক্তির জায়গা, যেখানে সূচকভিত্তিক অবস্থান ১১। এই ইতিবাচক দিকটি স্বীকার করা জরুরি।

কিন্তু মানবসম্পদ ও গবেষণায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৩তম, প্রায় তালিকার শেষ দিকে। শিক্ষা ব্যয় ২০২৪ সালে জিডিপির ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ; এই সূচকে অবস্থান ১২৯তম।

বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতকের অংশ নিয়ে GII-এর সর্বশেষ প্রাপ্য তথ্য ২০২০ সালের। মোট স্নাতকের ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ, সূচকে অবস্থান ১১৫তম। তথ্যটি পুরোনো বলে বর্তমান পরিস্থিতির নিখুঁত ছবি নয়, কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ভিত্তি শক্তিশালী করার প্রয়োজনটি স্পষ্ট করে।

আরও বড় সতর্কবার্তা হলো তথ্যের ঘাটতি। GII জানায়, বাংলাদেশের ১১টি উদ্ভাবন-সংক্রান্ত সূচকের তথ্য অনুপস্থিত এবং আরও ১১টির তথ্য পুরোনো। প্রতি দশ লাখ মানুষে কত পূর্ণকালীন গবেষক আছেন, গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির কত অংশ ব্যয় হয়, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান কত গবেষণা ও উন্নয়নে অর্থায়ন করে—এমন মৌলিক তথ্যও আন্তর্জাতিকভাবে তুলনীয় সাম্প্রতিক ডাটাবেসে নেই।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে হলে আগে নিজের গবেষণা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থার আকার, শক্তি ও দুর্বলতা নিয়মিতভাবে মাপতে পারাও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অংশ।

বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের সংযোগ নিয়েও সতর্কভাবে তথ্য পড়তে হয়। GII-এর একটি জরিপভিত্তিক সূচকে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প গবেষণা সহযোগিতায় অবস্থান ১২৪তম, আবার নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার সূচকে অবস্থান ৭৭তম। তাই একটি সংখ্যা দিয়ে পুরো সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।

তবে অন্য সূচকগুলোও জ্ঞানকে প্রয়োগে রূপান্তরের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়: জ্ঞান আত্তীকরণে অবস্থান ১২৫তম, জিডিপির তুলনায় পেটেন্ট ফলাফলে ১২৪তম এবং জিডিপির তুলনায় বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি গবেষণাপত্রে ১১৭তম।

অন্যদিকে উদ্ধৃতিযোগ্য গবেষণাপত্রের এইচ-ইনডেক্সে অবস্থান ৫৯তম। সহজভাবে বললে, কিছু গবেষণার আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা আছে; কিন্তু সেই জ্ঞানকে ব্যাপক প্রযুক্তি, পেটেন্ট, ব্যবসায়িক প্রয়োগ ও উৎপাদনশীলতায় রূপান্তরের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে দুর্বল।

তুলনামূলক দেশগুলো এই ব্যবধান বোঝাতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের মতো নিম্ন-মধ্যম আয়ের গোষ্ঠীতে ভারত ২০২৫ সালে GII-তে ৩৮তম এবং মানবসম্পদ ও গবেষণায় ৫৪তম; ভিয়েতনাম যথাক্রমে ৪৪তম ও ৭০তম। উচ্চ-মধ্যম আয়ের মালয়েশিয়া সামগ্রিকভাবে ৩৪তম এবং মানবসম্পদ ও গবেষণায় ৪৬তম। দীর্ঘমেয়াদি তুলনামূলক মানদণ্ড হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়া সামগ্রিক উদ্ভাবনে চতুর্থ এবং মানবসম্পদ ও গবেষণায় প্রথম।

এসব দেশের বাস্তবতা বাংলাদেশের মতো নয়, তাই অনুকরণের প্রশ্ন নেই। শিক্ষা হলো, বর্তমান আয়স্তরের সঙ্গে মানানসই ফল করলেই ২০৩১ সালের উচ্চ-মধ্যম আয়ের লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট হবে না; বর্তমান সক্ষমতার চেয়ে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার উন্নয়ন দরকার।

জ্ঞানভিত্তিক সমাজ মানে শুধু বেশি গবেষণাপত্র নয়

জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নকে কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বা বিজ্ঞানীর অগ্রাধিকার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। একটি কার্যকর জ্ঞানব্যবস্থায় অন্তত চার ধরনের সক্ষমতা একসঙ্গে দরকার। কেউ নতুন জ্ঞান তৈরি করবেন; শিক্ষক ও প্রশিক্ষকেরা সেই জ্ঞান ও দক্ষতা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেবেন; শিল্প ও উদ্যোক্তারা সেটিকে নতুন পণ্য, সেবা, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতায় রূপান্তর করবেন; আর প্রশাসন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকেরা সেই জ্ঞান ব্যবহার করে ভালো সিদ্ধান্ত নেবেন। এই চার অংশের যেকোনো একটি দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থার ফল কমে যায়।

বাংলাদেশের বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ তাই মেধার ঘাটতি নয়; বরং মেধাকে উচ্চদক্ষতা, গবেষণা, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা এবং ভালো নীতিতে রূপান্তরের ধারাবাহিক ব্যবস্থার ঘাটতি। এই জায়গায় তিনটি বড় পরিবর্তন সবচেয়ে জরুরি।

প্রথম পরিবর্তন : মানুষ ও উচ্চদক্ষতায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ

একজন ভালো বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, গবেষক, তথ্যবিশ্লেষক বা নীতিনির্ধারক তৈরি করতে বহু বছর লাগে। আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, জীবপ্রযুক্তি, জলবায়ু বিজ্ঞান, উন্নত উৎপাদন, আর্থিক প্রযুক্তি কিংবা আধুনিক জননীতি বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্রে দক্ষতা দ্রুত বদলায়। তাই একটি ডিগ্রি দিয়েই পেশাগত প্রস্তুতি শেষ হয় না; উচ্চদক্ষতার ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রয়োজন।

এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়। আজকের একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা বা নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তাকে শুধু বিধি ও দাপ্তরিক প্রক্রিয়া জানলেই হয় না। তাকে তথ্য বুঝতে হবে, গবেষণার মান বিচার করতে হবে, নীতির ব্যয় ও সুফল তুলনা করতে হবে, ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল রূপান্তরের সম্ভাবনা ও বিপদ বুঝতে হবে এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে ভাবতে হবে।

গবেষক যত ভালো গবেষণালব্ধ প্রমাণই তৈরি করুন, নীতিনির্ধারক যদি তা বুঝতে ও ব্যবহার করতে না পারেন, গবেষণার সামাজিক সুফল কমে যায়। বাংলাদেশের বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, এনএপিডি এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তাই শুধু কোর্স ও সনদ প্রদানের জায়গা না থেকে আরও শক্তিশালী নীতি-শিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্র হতে পারে।

জ্বালানি নীতি নিয়ে প্রশিক্ষণ হলে প্রশাসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ ও গবেষক একই বাস্তব নীতি সমস্যা নিয়ে কাজ করতে পারেন। স্বাস্থ্যনীতিতে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, তথ্যবিশ্লেষক ও সরকারি কর্মকর্তা একসঙ্গে কাজ করতে পারেন। প্রশিক্ষণের ফল শুধু কতজন সনদ পেলেন দিয়ে নয়, বাস্তব সমস্যা কত ভালোভাবে বিশ্লেষণ ও সমাধান করা গেল, তা দিয়েও মাপা উচিত।

বিসিএস প্রশাসন একাডেমির ঘোষিত কার্যপরিধিতেই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি গবেষণা, জ্ঞান বিনিময় এবং অংশীদারত্বের ভিত্তি রয়েছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি কলেজ এবং বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও গবেষকদের জন্য উচ্চমানের পিএইচডি, পোস্টডক্টরাল প্রশিক্ষণ, গবেষণাগার সংযুক্তি, গবেষণা নেতৃত্ব, উন্নত গবেষণাপদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার সুযোগ বাড়াতে হবে।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারসহ সরকারি কলেজশিক্ষকদেরও শুধু নিয়মিত পাঠদান ও প্রশাসনিক পদোন্নতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণা-ছুটি, বিশ্ববিদ্যালয় সংযুক্তি, প্রতিযোগিতামূলক ফেলোশিপ এবং শিক্ষানীতি গবেষণার পথ খুলে দেওয়া যায়।

এখানেই বেতন, আর্থিক প্রণোদনা ও কর্মজীবনের কাঠামোর গুরুত্ব আসে। উচ্চদক্ষ মানুষের একটি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার আছে। দেশে দীর্ঘ শিক্ষা ও বিশেষায়িত প্রস্তুতির আর্থিক ও পেশাগত মূল্য যদি যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হয়, বিদেশে যাওয়া কিংবা অন্য পেশা বেছে নেওয়া অনেক সময় যৌক্তিক বাজারসিদ্ধ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়।

মেধাপাচার তাই শুধু দেশপ্রেমের প্রশ্ন নয়। প্রতিযোগিতামূলক বেতন, পেশাগত স্বাধীনতা, অর্থবহ কর্মজীবন অগ্রগতি, গবেষণা সুবিধা, প্রশিক্ষণ এবং পরিবার নিয়ে সম্মানজনক জীবন—সব মিলিয়েই মেধা ধরে রাখার পরিবেশ তৈরি হয়।

রাষ্ট্রের সেরা মেধা প্রশাসনে প্রয়োজন। একইভাবে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতা, গবেষণা এবং প্রযুক্তিতেও প্রয়োজন। নীতির লক্ষ্য কোনো পেশাকে আরেকটির বিরুদ্ধে দাঁড় করানো নয়; লক্ষ্য হলো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো জ্ঞানভিত্তিক পেশা যেন সবচেয়ে মেধাবী তরুণের কাছে অর্থনৈতিক বা পেশাগতভাবে অযৌক্তিক পছন্দ হয়ে না দাঁড়ায়।

দ্বিতীয় পরিবর্তন : গবেষণা অর্থায়নকে একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থায় রূপ দেওয়া

বাংলাদেশে গবেষণা অর্থায়ন নেই, এমন বলা সঠিক নয়। বাংলাদেশ গবেষণা কাউন্সিলের বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্প, গবেষণা সহায়তা ও ফেলোশিপ রয়েছে; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিশেষ গবেষণা অনুদান ও জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেলোশিপ দেয়; আইসিটি বিভাগ গবেষণা ও উদ্ভাবনে সহায়তা দেয়; স্বাস্থ্য, কৃষি এবং অন্যান্য বিশেষায়িত খাতেও পৃথক তহবিলব্যবস্থা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল, উন্নয়ন সহযোগী এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা অর্থদাতাদের সুযোগও রয়েছে।

অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি আছে; চ্যালেঞ্জ হলো এগুলোকে আরও সমন্বিত, সহজলভ্য ও কৌশলগত করা।

একজন গবেষককে যদি গবেষণা অনুদানের সুযোগ খুঁজতে বহু মন্ত্রণালয়, সংস্থা ও ওয়েবসাইট ঘুরতে হয়, অথবা ছোট অনুদান পেতেও দীর্ঘ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বারবার অনুমোদন ও কাগজপত্রের চাপের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তাহলে গবেষকের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়; সেটি গবেষণার বদলে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সামলাতে ব্যয় হয়।

অর্থায়নব্যবস্থা শুধু ন্যায্য হলেই যথেষ্ট নয়; সেটি স্বচ্ছ, দ্রুত এবং ন্যায্য বলে দৃশ্যমানও হতে হবে। ব্যক্তিগত যোগাযোগজাল বা প্রাতিষ্ঠানিক নৈকট্য সুবিধা দেয়, এমন ধারণা তৈরি হলেও ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এখানে একটি জাতীয় গবেষণা-অর্থায়ন পোর্টাল কার্যকর ও তুলনামূলক কম খরচের সংস্কার হতে পারে। সরকারি ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অনুদানের আহ্বান, অগ্রাধিকার ক্ষেত্র, যোগ্যতা, সময়সীমা, মূল্যায়ন মানদণ্ড এবং অনুদানপ্রাপ্তির তথ্য এক জায়গায় থাকলে গবেষকদের প্রবেশাধিকার ও স্বচ্ছতা বাড়বে। একইসঙ্গে সরকার বুঝতে পারবে কোথায় গবেষণা অর্থায়ন অতিরিক্ত ছড়িয়ে আছে এবং কোথায় গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা প্রায় অর্থ পাচ্ছে না।

গবেষণা অর্থায়নেরও স্তর থাকা উচিত। নতুন ধারণা পরীক্ষা করার জন্য ছোট প্রাথমিক গবেষণা অনুদান প্রয়োজন। সক্ষম গবেষক দলের জন্য তিন থেকে পাঁচ বছরের গবেষক-নেতৃত্বাধীন বহুবছরমেয়াদি অনুদান দরকার। আবার খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু অভিযোজন, জনস্বাস্থ্য, জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত কৃষি বা শিল্পপ্রযুক্তির মতো সীমিত কয়েকটি জাতীয় অগ্রাধিকারে পাঁচ থেকে ১০ বছরের লক্ষ্যভিত্তিক গবেষণা কর্মসূচি থাকতে পারে।

একটি গবেষণাগার, দীর্ঘমেয়াদি তথ্যভাণ্ডার বা জটিল প্রযুক্তি কর্মসূচি বার্ষিক ক্ষুদ্র প্রকল্প দিয়ে তৈরি করা যায় না।

অর্থের সীমাবদ্ধতাও বাস্তব। নতুন বেতনস্কেলই বড় রাজস্ব ব্যয়ের দায় তৈরি করেছে। তাই ‘সবখানে আরও টাকা’ কোনো কার্যকর কৌশল নয়। ছোট অনুদানের প্রয়োজন বজায় রেখে কিছু বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি একত্র করা, সংখ্যায় কম কিন্তু বড় প্রতিযোগিতামূলক বহুবছরমেয়াদি অনুদান চালু করা এবং শিল্প-অর্থায়িত গবেষণার বিপরীতে সমপরিমাণ বা আংশিক সরকারি সহ-অর্থায়ন দেওয়া তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত পথ। এতে সরকারি অর্থের সঙ্গে বেসরকারি অর্থও গবেষণা পরিবেশে যুক্ত হবে।

অর্থায়নের সঙ্গে জবাবদিহি অবশ্যই থাকবে। কিন্তু সব গবেষণার জন্য একই কর্মসম্পাদন সূচক (KPI) চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কৃষিতে সফলতা হতে পারে নতুন জাত বা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি; প্রকৌশলে প্রোটোটাইপ বা প্রযুক্তি হস্তান্তর; স্বাস্থ্য গবেষণায় চিকিৎসাবিষয়ক প্রমাণ; সামাজিক বিজ্ঞানে নীতি পরিবর্তন, নির্ভরযোগ্য তথ্যভাণ্ডার বা কর্মসূচি মূল্যায়ন।

শুধু কতটি গবেষণাপত্র, সেমিনার বা প্রতিবেদন হলো, সেটিই কর্মফল নয়। একই সঙ্গে পদ্ধতিগতভাবে সৎ গবেষণার ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ থাকতে হবে; না হলে গবেষক কম ঝুঁকির এবং দ্রুত ফল পাওয়া বিষয়ে আটকে যাবেন।

আর একটি মৌলিক সংস্কার হলো পরিমাপ। GII-তে প্রতি দশ লাখে গবেষকের সংখ্যা এবং জিডিপির তুলনায় গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ব্যয়ের মতো তথ্য অনুপস্থিত থাকা দেখায় যে জাতীয় গবেষণা পরিসংখ্যান নিয়মিতভাবে হালনাগাদ ও আন্তর্জাতিকভাবে তুলনীয় করা জরুরি।

কত টাকা খরচ করছি, কে খরচ করছে, কোন খাতে গবেষকেরা কাজ করছেন এবং ফল কী হচ্ছে—এগুলো না জানলে ভালো গবেষণানীতিও তৈরি করা কঠিন।

তৃতীয় পরিবর্তন : জ্ঞানকে শিল্প, সরকার ও সমাজে পৌঁছানো

গবেষণা তৈরিই শেষ লক্ষ্য নয়। জ্ঞান ব্যবহার না হলে তার সামাজিক সুফল সীমিত থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে গবেষক, শিক্ষার্থী ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান আছে; শিল্প জানে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও বাজারের বাস্তব সমস্যা; সরকার জানে জাতীয় অগ্রাধিকার ও নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতা। এই তিন পক্ষ আলাদা থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাপত্র প্রকাশ করে, শিল্প বিদেশি সমাধান কেনে এবং সরকার আবার আলাদাভাবে পরামর্শক খোঁজে।

ওষুধশিল্প, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, কৃষি, ব্যাংকিং ও ফিনটেক, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ এবং উদীয়মান প্রযুক্তি খাতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে লক্ষ্যভিত্তিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা যেতে পারে। শিল্প একটি বাস্তব গবেষণা ও উন্নয়ন সমস্যা এবং সহ-অর্থায়ন দেবে, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সক্ষমতা দেবে, আর সরকার স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক সহ-অর্থায়ন, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং যৌথ অবকাঠামো দিতে পারে।

ব্যয়বহুল গবেষণাগার ও যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও যৌথ ব্যবহারযোগ্য গবেষণাগার মডেল একই বিনিয়োগের পুনরাবৃত্তি কমাতে পারে।

গবেষণা থেকে নীতিতে সংযোগও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি নিরাপত্তা, ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা, শিক্ষার মান, স্বাস্থ্য অর্থায়ন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বা জলবায়ু অভিযোজনের মতো সমস্যা কোনো এক বিষয়ক্ষেত্র বা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

নির্বাচিত কিছু মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় ছোট প্রমাণভিত্তিক নীতি-সেল বা নীতি গবেষণাগার পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যায়, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাঠামোবদ্ধ অংশীদারত্ব থাকবে। নতুন বড় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না বাড়িয়ে দুই বা তিনটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে শুরু করে কয়েক বছর পর পরিমাপযোগ্য ফল দেখে কর্মসূচি বাড়ানো বা বন্ধ করা যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বিলাসিতা নয়। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান দ্রুত শেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার মাপকাঠি শুধু কতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলো, তা নয়; যৌথ অনুদান, যৌথ তত্ত্বাবধানে পিএইচডি, গবেষক বিনিময়, যৌথ গবেষণাগার, যৌথ পেটেন্ট, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কর্মসূচি আরও অর্থবহ সূচক।

বিদেশে থাকা বাংলাদেশি বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও বিশেষায়িত পেশাজীবীদের ক্ষেত্রেও একই বাস্তববাদ দরকার। সবাই স্থায়ীভাবে দেশে ফিরবেন, এমন প্রত্যাশা প্রয়োজন নেই। যৌথ নিয়োগ, অতিথি অধ্যাপনা, দূরবর্তী তত্ত্বাবধান, প্রবাসী গবেষণা অনুদান ও যৌথ গবেষণাগার কর্মসূচির মাধ্যমে মেধাপাচারের একটি অংশকে মেধা ও জ্ঞানের পুনঃচলাচলে রূপ দেওয়া সম্ভব। জ্ঞান যদি নিয়মিত দেশে প্রবাহিত হয়, ভৌগোলিক অবস্থান একমাত্র শর্ত নয়।

কেন পরিবর্তনগুলো এত ধীর?

এই প্রস্তাবগুলোর অনেকটাই নতুন নয়। শিক্ষা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ, উদ্ভাবন এবং শিল্প-সংযোগ নিয়ে বাংলাদেশে বহু বছর ধরে আলোচনা হয়েছে।

তাহলে পরিবর্তন এত ধীর কেন?

একটি কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্ছিন্নতা। শিক্ষা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, শিল্পনীতি এবং সরকারি খাতের প্রশিক্ষণ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা ঘরে চলে। প্রতিটি সংস্থা নিজের কর্মসূচি চালায়, কিন্তু পুরো জাতীয় জ্ঞানশৃঙ্খলের ফল কে মাপবে, সেই দায়িত্ব অস্পষ্ট থাকে।

দ্বিতীয়ত, দৃশ্যমান প্রকল্পের ফল তুলনামূলকভাবে দ্রুত দেখানো যায়। একটি ভবন, গবেষণাগার বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কতজনকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, তা সহজে দেখানো যায়। কিন্তু একজন বিশ্বমানের গবেষক তৈরি হলো কি না, কোনো মন্ত্রণালয় গবেষণালব্ধ প্রমাণ ভালোভাবে ব্যবহার করছে কি না, শিল্প দেশীয় গবেষণা থেকে প্রযুক্তি গ্রহণ করছে কি না—এসব ফল ধীরে আসে এবং মাপাও কঠিন। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা গঠন সহজেই স্বল্পমেয়াদি কর্মকাণ্ডের পেছনে পড়ে যায়।

তৃতীয়ত, প্রণোদনা কাঠামো অনেক সময় সহজে গণনাযোগ্য পরিমাণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। প্রকাশনার সংখ্যা, প্রশিক্ষণে উপস্থিতি বা প্রকল্প সমাপ্তি সহজে গোনা যায়; কিন্তু মান, শেখা, নীতিতে ব্যবহার বা প্রযুক্তি আত্তীকরণ মাপা কঠিন। অথচ জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের জন্য কর্মকাণ্ড নয়, সক্ষমতা ও প্রভাবকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।

দশ বছর মেয়াদি একটি জাতীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবন কৌশল

বাংলাদেশকে তাই সব সমস্যার সমাধানে নতুন আরেকটি বড় কর্তৃপক্ষ তৈরি করতে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় আছে, বিশেষায়িত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে, বাংলাদেশ গবেষণা কাউন্সিল ও খাতভিত্তিক গবেষণা তহবিল আছে, বিসিএস প্রশাসন একাডেমি ও অন্যান্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান আছে, এনএসডিএ ও শিল্প খাতের সংগঠন আছে, বেসরকারি খাত এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারও রয়েছে। মূল প্রয়োজন সমন্বয়, ধারাবাহিকতা এবং অভিন্ন দিকনির্দেশনা।

একটি দশ বছর মেয়াদি জাতীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবন কৌশল বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে কয়েকটি অভিন্ন ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। এর কেন্দ্রীয় তিনটি লক্ষ্য হতে পারে:

এক. কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিশ্বমানের মানবসম্পদ ও ধারাবাহিক উচ্চদক্ষতার প্রশিক্ষণ;

দুই. স্বচ্ছ, বৈচিত্র্যময় এবং বহুবছরমেয়াদি গবেষণা অর্থায়ন;

তিন. গবেষণাকে শিল্প, নীতি ও আন্তর্জাতিক জ্ঞান নেটওয়ার্কের সঙ্গে নিয়মিত যুক্ত করা।

এই কৌশলের অগ্রগতি শুধু ‘কত টাকা বরাদ্দ হলো’ দিয়ে মাপা উচিত নয়। কত উচ্চদক্ষ গবেষক তৈরি হলো, সরকারি কর্মকর্তাদের গবেষণালব্ধ প্রমাণ ব্যবহারের সক্ষমতা কত বাড়ল, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক অনুদান কত এল, শিল্প-অর্থায়িত গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কত বাড়ল, দেশীয় গবেষণা কত নীতিতে ব্যবহৃত হলো, পেটেন্ট ও প্রযুক্তি হস্তান্তর কীভাবে বদলাল এবং গবেষণা তথ্য কত নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য হলো—এসবের একটি জাতীয় জ্ঞান সূচকপঞ্জি তৈরি করা যেতে পারে।

এই কাঠামো এলডিসি উত্তরণের সঙ্গেও যুক্ত। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি অতিরিক্ত প্রস্তুতিকালের পক্ষে মত দিলেও দেশীয় কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। অর্থাৎ শুধু উত্তরণের তারিখ পিছালেই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি হবে না।

বিশ্বব্যাংকের মধ্যম আয়ের দেশের বিশ্লেষণও বলে, নিম্ন-মধ্যম আয় থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ে যেতে বিনিয়োগের সঙ্গে প্রযুক্তি আত্তীকরণ এবং পরে নিজস্ব উদ্ভাবন প্রয়োজন। তাই জ্ঞান সক্ষমতা কোনো ‘শিক্ষা খাতের আলাদা অগ্রাধিকার’ নয়; এটি বাণিজ্য, শিল্প, জনপ্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির অগ্রাধিকার।

২০৩১-এর প্রস্তুতি আসলে আজকের সিদ্ধান্ত

একটি সেতু, মহাসড়ক বা বিদ্যুৎকেন্দ্র চোখে দেখা যায়। একজন উৎকৃষ্ট অধ্যাপক, বিজ্ঞানী বা প্রমাণভিত্তিক নীতিনির্ধারকের প্রভাব একইভাবে দৃশ্যমান নয়। কিন্তু একজন কৃষিবিজ্ঞানীর একটি উদ্ভাবন লাখো কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে; একজন চিকিৎসা গবেষকের প্রমাণ চিকিৎসাপদ্ধতি বদলে দিতে পারে; একজন প্রকৌশলী আমদানিকৃত প্রযুক্তির দেশীয় বিকল্প তৈরি করতে পারেন; একজন ভালো শিক্ষক বহু বছর ধরে হাজারো শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেন। একইভাবে একজন উচ্চদক্ষ নীতিনির্ধারক একটি ভুল সিদ্ধান্ত এড়িয়ে দেশের বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি ঠেকাতে পারেন।

এই মানুষগুলো একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নন। একজন জ্ঞান তৈরি করেন, আরেকজন সেই জ্ঞান শেখান, শিল্প সেটিকে অর্থনৈতিক মূল্যে রূপ দেয়, আর নীতিনির্ধারক তা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে ভালোভাবে পরিচালনা করেন। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তখনই তৈরি হয়, যখন এই পুরো শৃঙ্খল কার্যকরভাবে কাজ করে।

জাতীয় বেতনস্কেলের বর্তমান আলোচনা তাই শুধু কে কত পেলেন, সেখানে থেমে না থাকুক। বরং বড় প্রশ্নটি হোক: আমাদের সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের কাছে রাষ্ট্র কী সংকেত পাঠাচ্ছে? তাদের দক্ষতা কীভাবে ক্রমাগত উন্নত হচ্ছে? গবেষকের ভালো ধারণা কত দ্রুত সহায়তা পাচ্ছে? প্রশাসক ও নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তারা কতটা প্রমাণভিত্তিক? বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প কতটা একসঙ্গে সমস্যা সমাধান করছে? এবং বিশ্বের জ্ঞান নেটওয়ার্কের সঙ্গে বাংলাদেশ কতটা গভীরভাবে যুক্ত?

জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ শুধু বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশের বাংলাদেশ নয়। এটি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে মেধাকে তৈরি ও ধরে রাখা হয়, দক্ষতা সারাজীবন উন্নত করা হয়, গবেষণাকে দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ দেওয়া হয়, শিল্প সেই জ্ঞানকে উৎপাদনশীলতায় রূপ দেয় এবং সরকার গবেষণালব্ধ প্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়।

২০৩১ এবং তার পরের বাংলাদেশের প্রস্তুতি তাই শুধু মাথাপিছু আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা নয়। এটি মানুষের মেধা ও জ্ঞানকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনশীল সম্পদে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা।

লেখক : অধ্যাপক, ব্র্যাক বিজনেস স্কুল

কেকে/এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close