বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● টানা তিন দফা কমার পর আবারও বাড়ল স্বর্ণের দাম      ● তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● চার জেলায় নতুন ডিসি      ● এক দিন বেড়ে দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিনের ছুটি, প্রধানমন্ত্রী বাড়ালেন অনুদানও      ● দেশে হামে মৃত্যু ছাড়ালো ১১০০      ● ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু, সর্বোচ্চ আক্রান্ত ঢাকা বিভাগে      ● হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ শিশুর মৃত্যু      
ফিচার
রাগকে কি আমরা অজান্তেই প্রশ্রয় দিচ্ছি?
খোলা কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৪ এএম আপডেট: ৩০.০৯.২০২৬ ১১:২৬ এএম
সংগৃহীত ছবি

সংগৃহীত ছবি

‘ও একটু রাগী, কিন্তু রাগী হলে কী হবে, ওর মনটা ভালো।’

‘ও যখন একটু রাগী হয়, তুমি মানিয়ে নিতে পারো না?’

‘ওর অভিমানটা বড্ড বেশি, ওকে একটু তোষামোদ করলেই পারো।’

পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজনের মধ্যে এমন রাগী বা অভিমানী কেউ থাকলে এ ধরনের কথা হরহামেশাই শুনতে হয়। কোনো পারিবারিক আয়োজন, ফ্যামিলি গ্যাদারিং কিংবা বিয়ের অনুষ্ঠানে আয়োজকদের অন্যতম চিন্তা হয়ে দাঁড়ায়—কীভাবে সেই রাগী বা অভিমানী আত্মীয়কে সন্তুষ্ট রাখা যায়, যেন কোনোভাবেই তিনি রাগ না করেন।

কিন্তু কখনো কি আমরা ভেবে দেখেছি, এভাবে কাউকে বারবার তোষামোদ করে আমরা কি তার রাগকে অজান্তেই প্রশ্রয় দিচ্ছি? রাগ করলেই যদি পরিবারের সবাই তাকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে সেই আচরণ কি ধীরে ধীরে তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে? এতে কি সত্যিই তার রাগ কমছে, নাকি উল্টো রাগ প্রকাশ করাটাই তার জন্য মনোযোগ বা নিজের কথা আদায়ের একটি কার্যকর উপায় হয়ে উঠছে?

রাগ কি সবসময় খারাপ?

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রাগ নিজেই অস্বাভাবিক কোনো অনুভূতি নয়। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) বলছে, রাগ মানুষের স্বাভাবিক আবেগ। তবে সেটি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং পরিবার, বন্ধুত্ব, কর্মক্ষেত্র কিংবা অন্য সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, তখন তা সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

রাগের কারণও সবার ক্ষেত্রে এক নয়। কারও ক্ষেত্রে অপমান, অবহেলা বা প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার অনুভূতি কাজ করতে পারে। কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের হতাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা নির্দিষ্ট কোনো পরিস্থিতি রাগের কারণ হতে পারে। আবার কখনো নিজের গুরুত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা বা মনোযোগ পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও আচরণে প্রকাশ পেতে পারে।

তাই পরিবারের কোনো একজনকে শুধু ‘রাগী মানুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে তার আচরণের ধরন ও পেছনের কারণ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি।

তোষামোদ কি সমস্যার সমাধান?

পরিবারের শান্তি বজায় রাখতে অনেক সময় আমরা রাগী সদস্যকে খুশি রাখার চেষ্টা করি। অনুষ্ঠানে তার পছন্দকে অগ্রাধিকার দেওয়া, রাগ করলে বারবার গিয়ে বোঝানো কিংবা অন্যদের দিয়ে তাকে ‘ম্যানেজ’ করা—এসব হয়তো তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি শান্ত করে।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে শুধু এভাবে পরিস্থিতি সামাল দিলে মূল সমস্যাটি নিয়ে আলোচনা নাও হতে পারে। বরং ব্যক্তিটি যদি বারবার দেখেন যে রাগ বা অভিমান করলেই অন্যরা তার কাছে গিয়ে তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছে, তাহলে সেই আচরণের পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব নাও করতে পারেন।

তবে এটিকে সব রাগী মানুষের ক্ষেত্রে একই নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক নয়। রাগের প্রকাশ, ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক ও পরিস্থিতি—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়।

রাগের নিচে কি অন্য কোনো অনুভূতি থাকে?

অনেক সময় প্রকাশ্য রাগের আড়ালে অন্য কোনো অনুভূতি থাকতে পারে। কেউ হয়তো মনে করছেন তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, কেউ হয়তো প্রত্যাখ্যাত বা অবহেলিত বোধ করছেন, আবার কেউ নিজের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় হতাশ।

তবে শুধু রাগের আচরণ দেখেই কোনো ব্যক্তির হীনমন্যতা, নিরাপত্তাহীনতা বা মনোযোগের চাহিদা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। এর জন্য ব্যক্তির দীর্ঘমেয়াদি আচরণ, পরিস্থিতি ও অনুভূতি বোঝা প্রয়োজন।

এপিএ-র তথ্য অনুযায়ী, রাগ নিয়ন্ত্রণে প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো কোন পরিস্থিতি বা ঘটনা রাগ বাড়িয়ে দেয়, সেই ট্রিগারগুলো শনাক্ত করা। একই সঙ্গে রাগের আগে কী ধরনের চিন্তা কাজ করছে, সেটিও বোঝার চেষ্টা করা হয়।

তাহলে পরিবারের করণীয় কী?

রাগকে ভয় না পেয়ে অনুভূতিকে গুরুত্ব দিতে হবে

কেউ রাগ করলে ‘তুমি সবসময় এমন’ না বলে জানতে চাওয়া যেতে পারে—‘কোন বিষয়টি তোমার খারাপ লেগেছে?’ এতে অভিযোগের বদলে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়।

রাগ এবং আক্রমণাত্মক আচরণকে এক করে দেখা যাবে না

কারও কষ্ট বা অভিমানকে গুরুত্ব দেওয়া মানে তার চিৎকার, অপমান, ভয় দেখানো কিংবা অন্যকে হেয় করার আচরণ মেনে নেওয়া নয়।

শান্ত সময়ে কথা বলতে হবে

রাগের মুহূর্তে তর্ক বাড়ানোর পরিবর্তে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা বেশি কার্যকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞরাও উত্তেজনার মুহূর্তে বিরতি নিয়ে শান্ত হওয়ার পর নিজের উদ্বেগ ও প্রয়োজন স্পষ্টভাবে জানানোর পরামর্শ দেয়।

সীমারেখা স্পষ্ট করা জরুরি

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে—‘তোমার কথাটা আমরা শুনতে চাই। কিন্তু চিৎকার বা অপমানের মধ্যে এই আলোচনা করা সম্ভব নয়। তুমি শান্ত হলে আমরা কথা বলব।’

এ ধরনের দৃঢ় কিন্তু সম্মানজনক যোগাযোগকে ‘assertive communication’ বলা হয়। এতে নিজের অনুভূতি ও প্রয়োজন স্পষ্টভাবে জানানো যায়, একই সঙ্গে অন্য ব্যক্তির অধিকার ও অনুভূতিকেও সম্মান করা হয়।

‘তুমি সবসময়’ বা ‘তুমি কখনোই’ ধরনের কথা এড়িয়ে চলা ভালো

এর পরিবর্তে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা যেতে পারে। যেমন—‘তুমি কখনো আমার কথা শোনো না’ বলার বদলে ‘তুমি এভাবে কথা বললে আমি কষ্ট পাই’ বলা যেতে পারে। 

নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণেও দায়িত্ব নিতে হবে

পরিবারের অন্য সদস্যরা যেমন আচরণ সামলাতে পারেন, তেমনি যে ব্যক্তি বারবার রেগে যান, তারও নিজের আচরণের দায়িত্ব নেওয়া প্রয়োজন।

রাগ উঠতে শুরু করলে পরিস্থিতি থেকে সাময়িকভাবে সরে যাওয়া, গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া, কিছুক্ষণ চুপ থাকা, হাঁটাহাঁটি করা কিংবা পরে আলোচনায় ফিরে আসার মতো কৌশল কাজে লাগতে পারে। APA রাগের প্রাথমিক সংকেত শনাক্ত করা, প্রয়োজনে পরিস্থিতি থেকে সাময়িক দূরে সরে যাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাস ও শিথিলায়ন কৌশল এবং চিন্তার ধরন পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে।

কখন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন?

রাগ যদি নিয়মিতভাবে পরিবার বা অন্য সম্পর্ক নষ্ট করে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, পরে অনুশোচনা হয় কিংবা নিজের বা অন্যের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে, তখন বিষয়টি শুধু ‘স্বভাব’ বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।

এপিএ বলছে, রাগ ব্যবস্থাপনায় কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT), পরিবারভিত্তিক থেরাপি এবং অন্যান্য মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী রাগের ট্রিগার ও আচরণের ধরন চিহ্নিত করে উপযুক্ত কৌশল তৈরিতে সহায়তা করতে পারেন।

ভালোবাসা থাকবে, তবে সীমারেখাও থাকবে

পরিবারের কাউকে ভালোবাসা মানে তার প্রতিটি আচরণ মেনে নেওয়া নয়। আবার কারও রাগকে অস্বীকার করাও সমাধান নয়।

রাগের পেছনে থাকা অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা, শান্তভাবে কথা বলা, প্রয়োজনীয় সীমারেখা তৈরি করা এবং নিজের আচরণের দায়িত্ব নেওয়া—এই চারটি বিষয় একটি সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ।

কারও রাগকে ভয় পেয়ে প্রতিবার তোষামোদ করার বদলে তাকে বোঝার চেষ্টা করা প্রয়োজন। কারণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু একজনের নয়; সেখানে প্রত্যেকের অনুভূতি, সম্মান, দায়িত্ববোধ এবং আচরণের ভূমিকা রয়েছে।


সূত্র: আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ)

কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  রাগ   মানসিক অবস্থা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

ফিচার- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close