গানের জগতে পথচলার চার দশকেরও বেশি সময়। এর মধ্যে বদলে গেছে প্রজন্ম, বদলেছে শ্রোতার রুচি, এসেছে গানের নতুন নতুন ধারা। প্রযুক্তির পরিবর্তনে বদলে গেছে গান শোনার ধরনও। কিন্তু কিছু কণ্ঠের আবেদন সময়ের সঙ্গে মুছে যায় না। বরং নতুন প্রজন্মের কাছেও হয়ে ওঠে পরিচিত, আপন। সেই তালিকায় অন্যতম এক নাম—জেমস।
রক, ফোক ও ব্যান্ড সংগীতের নিজস্ব স্বর দিয়ে যিনি বাংলা গানের ভুবনে আলাদা একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। তার কণ্ঠে যেমন ছিল বিদ্রোহের সুর, তেমনি ছিল প্রেম, বিরহ আর জীবনের গল্প। দীর্ঘ সংগীতযাত্রায় অসংখ্য গান উপহার দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার প্রিয় শিল্পী। ভক্তদের কাছে যার পরিচয় শুধু শিল্পী হিসেবে নয়—‘গুরু’ নামেই।
আজ ২ অক্টোবর। সংগীতের এই কিংবদন্তি শিল্পী ফারুক মাহফুজ আনাম জেমসের জন্মদিন। জন্মদিনে তাকে ঘিরে তাই ফিরে দেখা যায় সেই দীর্ঘ পথচলা—যেখানে ছিল স্বপ্ন, সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা আর শেষ পর্যন্ত নিজস্ব এক সংগীত সাম্রাজ্য গড়ে তোলার গল্প।
ঘর ছেড়ে গানের পথে
সংগীতের প্রতি টান ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু পরিবারের পছন্দ ছিল ভিন্ন। সরকারি চাকরিজীবী পরিবারের সন্তান হয়েও জেমস বেছে নেন অনিশ্চিত এক পথ—গান। নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে একসময় ঘর ছাড়েন তিনি।
কিশোর বয়সে চট্টগ্রামের আজিজ বোর্ডিংয়ে থাকা শুরু করেন জেমস। সেই সময়ই ধীরে ধীরে সংগীতের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর হয়। বন্ধুদের সঙ্গে গান, গিটার আর ব্যান্ড—সব মিলিয়ে তৈরি হতে থাকে তার শিল্পীসত্তার ভিত।
১৯৭৭ সালে এহসান এলাহী ফান্টির সঙ্গে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘ফিলিংস’। ব্যান্ডটির প্রধান গিটারিস্ট ও ভোকাল হিসেবে শুরু হয় তার সংগীতজীবনের নতুন অধ্যায়। পরবর্তী সময়ে ‘ফিলিংস’ পরিচিত হয় ‘নগরবাউল’ নামে। আর জেমস হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম প্রধান মুখ।
যে কণ্ঠে আলাদা হলো ব্যান্ড সংগীত
জেমসের গানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কণ্ঠ। প্রচলিত গায়কির বাইরে গিয়ে কর্কশ অথচ আবেগময় কণ্ঠে তিনি গেয়েছেন প্রেম, বেদনা, একাকিত্ব ও জীবনের নানা গল্প। তার গানের কথা ও পরিবেশনের ধরন তরুণদের মধ্যে তৈরি করে আলাদা এক আবেগ।
নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীত যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠছে, তখন জেমসও নিজের অবস্থান শক্ত করেন। একের পর এক জনপ্রিয় গান তাকে এনে দেয় বিপুল শ্রোতাপ্রিয়তা। শুধু গান নয়, পোশাক, চুলের ধরন, মঞ্চে উপস্থিতি—সবকিছুতেই তিনি হয়ে ওঠেন আলাদা এক প্রতীক।
সময়ের সঙ্গে তার শ্রোতাদের বয়স বদলেছে। কিন্তু জেমসের গান হারিয়ে যায়নি। বরং পুরোনো শ্রোতাদের নস্টালজিয়ার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছেও তার গান পৌঁছে গেছে।
সীমান্ত পেরিয়ে বলিউডে
বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে জনপ্রিয়তার পর পশ্চিমবঙ্গেও পরিচিতি পান জেমস। সেই সূত্র ধরেই ভারতীয় সংগীত পরিচালক প্রীতমের সঙ্গে তার যোগাযোগ তৈরি হয়।
২০০৫ সালে বলিউডের চলচ্চিত্র ‘গ্যাংস্টার’-এ প্লেব্যাকের মাধ্যমে ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে তার। ‘ভিগি ভিগি’ গানটি প্রকাশের পরই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। গানটি জেমসের কণ্ঠকে বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আরও বড় পরিসরে পরিচিত করে তোলে।
এরপর ‘ও লামহে’ চলচ্চিত্রে ‘চল চলে’ এবং ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’তে ‘রিশতে’ ও ‘আলবিদা’র মতো গানেও কণ্ঠ দেন তিনি। পরে ‘ওয়ার্নিং’ চলচ্চিত্রে ‘বেবাসি’ গানটির মাধ্যমে হিন্দি চলচ্চিত্রে আবারও শ্রোতাদের সামনে হাজির হন।
বলিউডে তার এই অধ্যায় ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। কারণ, একজন বাংলাদেশি ব্যান্ডশিল্পীর কণ্ঠ যে হিন্দি চলচ্চিত্রের মূলধারার শ্রোতাদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে, সেটিই তিনি প্রমাণ করেছিলেন।
কেন তিনি ‘গুরু’
জেমসের ক্ষেত্রে ‘গুরু’ শুধু একটি ডাকনাম নয়, এটি তার সঙ্গে শ্রোতার দীর্ঘ সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। মঞ্চে তার উপস্থিতি, কণ্ঠের স্বতন্ত্রতা এবং গানের প্রতি নিবেদন তাকে ভক্তদের কাছে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
নগর বাউল জেমসকে ভক্তরা 'গুরু' বলেই ডাকেন। পুরো নাম মাহফুজ আনাম।
গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে গুরু ডাকার কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, ‘গুরু মানে যিনি সবকিছু জানেন। আমি তেমন কিছুই না। ভালোবেসে তারা হয়ত আমাকে গুরু নামে ডাকেন। কবে থেকে আমাকে গুরু নামে ডাকা শুরু হয়েছে জানি না, কেন ডাকে তাও বলতে পারি না। হয়ত ভালোবেসে ডাকে।’
সময়ের সঙ্গে সংগীতের ভাষা বদলেছে। ক্যাসেট থেকে সিডি, সিডি থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—গান শোনার মাধ্যম বদলেছে বারবার। বদলেছে শ্রোতার পছন্দও। কিন্তু জেমসের গান থেকে গেছে মানুষের স্মৃতিতে।
কেউ তার গান শুনে ফিরে যান কৈশোরে, কেউ খুঁজে পান হারানো প্রেমের স্মৃতি, আবার কারও কাছে তার গান হয়ে ওঠে একাকিত্বের সঙ্গী। এভাবেই একজন শিল্পী শুধু গান করেন না; তিনি মানুষের জীবনের নানা মুহূর্তের অংশ হয়ে ওঠেন।
সময় পেরিয়েও অমলিন
চার দশকের বেশি সময়ের সংগীতযাত্রায় জেমস দেখেছেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের উত্থান, পরিবর্তন ও নতুন প্রজন্মের আগমন। তার সামনে দিয়ে বদলে গেছে সংগীতের বহু ধারা। তবুও নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছেন তিনি।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে জেমসকে তাই শুধু নব্বই দশকের শিল্পী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তিনি একাধিক প্রজন্মের শিল্পী। তার গান যেমন পুরোনো শ্রোতাকে স্মৃতির কাছে ফিরিয়ে নেয়, তেমনি নতুন শ্রোতাকেও টেনে নেয় তার নিজস্ব সুর ও কণ্ঠের জগতে।
জন্মদিনে তাই ভক্তদের ভালোবাসায় আবারও ফিরে আসে সেই পরিচিত ডাক—‘গুরু’। আর সেই ডাকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক দীর্ঘ সংগীতযাত্রার গল্প; ঘর ছেড়ে স্বপ্নের পথে বেরিয়ে পড়া এক কিশোরের গল্প, যে একদিন নিজের কণ্ঠেই তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের এক অনন্য অধ্যায়।
কেকে/সাশ